উত্তরকোণ

অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য , স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা  অভিযোগ  উঠেছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে

অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য , স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা  অভিযোগ  উঠেছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে

সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম।।
নিজেকে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় জনৈক শীর্ষ নেতার নিকটাত্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক পরিষদ (সাদা দল)’র পদোন্নতি বঞ্চিত এবং দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা পরিচয় দিয়ে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য , স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ গুরুতর নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মুহ: রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ফলে অঙ্কুরেই মুখ থুবড়ে পড়েছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিদ্যালয়। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী ও তদারকি সংস্থা (ইউজিসি)কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যে স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা পরিপন্থীভাবে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। পিছিয়ে পড়া জেলা কুড়িগ্রামকে এগিয়ে নিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু হলেও ভিসির এমন বিতর্কিত কর্মকান্ডে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে সচেতন মহলে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন না হলেও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশিং এন্ড হার্ভেস্ট বিভাগের প্রভাষক পদে মো. আহসানুল হক এবং ফিসারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগে মরিয়ম আক্তারকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ বিধি অনুযায়ী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য অনার্স ডিগ্রীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী থাকা বাধ্যতামূলক। যা এডহক ভিত্তিতে প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই যোগ্যতা থাকা বাঞ্চনীয়। এর মধ্যে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অক্টোবর ২০২৫ সালের প্রথম সপ্তাহে মো. আহসানুল হকের এমএস ডিগ্রী সম্পন্ন হলেও চাকুরীতে যোগদান দেখানো হয়েছে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মরিয়ম আক্তারের এমএস ডিগ্রী ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে সম্পন্ন হলেও চাকুরি যোগদান দেখানো হয়েছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। যাদের প্রভাষক পদে আবেদন করার যোগ্যতা আছে শুধুমাত্র তাদেরকেই এডহক বা খন্ডকালীন হিসেবে নিয়োগের নিয়ম থাকলেও নীতিমালা ভঙ্গ করে তাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন ভিসি ড. মুহ: রাশেদুল ইসলাম।এছাড়া বয়সসীমা উত্তীর্ণ হলেও আপন তিন ভাগ্নে-ভাগ্নিকে নিয়োগ দিয়েছে ভিসি ড. মুহ: রাশেদুল ইসলাম। তারা হলেন-৩৬ বছর বয়সী মো. আতিকুর রহমান পিএস টু ভিসি (সেকশন অফিসার) যিনি আপন বোনের ছেলে। ৩৪ বছর বয়সী সহকারী স্টোর কিপার (আপন বোনের ছেলে) মোছা. রেজভীন বেগম ও সেকশন অফিসার (পরীক্ষা বিভাগ) মো. গোলাম মোস্তফা। এছাড়া আপন বোনের মেয়ে সেকশন অফিসার (খামার) জান্নাতুল ফেরদৌস ও সেকশন অফিসার আপন শ্যালক মো আব্দুল্লাহ-আল সোহাগ। ইনভাইরনমেন্টাল সাইন্স হিসেবে ফুফা শ্বশুরের ছেলে রাইয়্যান রেজা এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট হিসেবে আপন ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রায়হান সরকারকে নিয়োগ দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলাম স্বাক্ষরিত একপত্রে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ লাভ করেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম। যোগদান করেই শুরু করেন বেপরোয়া স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্য। প্রভাষক পদে ২৬টি বিভাগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এডহক ভিত্তিতে ৮জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে কোন বাছাই কমিটি বা কোন রকম নিয়োগবিধি না মেনে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটকে খুঁশি করিয়ে সুকৌশলে নিয়োগ সম্পন্নের অভিযোগ রয়েছে। এরকম অবৈধ নিয়োগের ফলে কুড়িগ্রামবাসী সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি নিয়োগ সম্পন্ন করতে ভিসি প্রফেসর রাশেদুল ইসলাম পাঁতানো নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে একক এখতিয়ারে নিয়োগ দিয়েছেন যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নিয়মের পরিপন্থী। এসব কাজ নির্বিঘ্নে করতে আপন শ্যালক আব্দুল্লাহ্ সোহাগকে বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণভার দিয়েছেন। আগামীতে বিভিন্ন পদের নিয়োগ সম্পন্ন করতে আগাম ২৫ কোটি টাকা আপন শ্যালককে দিয়ে হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। আপন শ্যালককে দিয়ে সকল অনিয়ম-দুর্নীতি বাস্তবায়ন করে নিজে থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আকস্মিক তদন্তের ভয়ে ভিসি রাশেদুল ইসলাম সমস্ত ব্যক্তিগত ফাইল রেজিষ্ট্রার কার্যালয়ের পরিবর্তে নিজের কাছে রেখেছেন। অপরদিকে, নিয়োগ বিধি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। কিন্তু দেখা যায় শুধুমাত্র ১ জুন ২০২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৩৩৩ দিনের মধ্যে মাত্র ৪২দিন ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন ইচ্ছামত। শুধু তাই নয়, ঢাকার গেস্ট হাউজকে তিনি তার মূল অফিস বানিয়েছেন। যা ইউজিসি’র নিয়ম পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নিয়েও তিনি লুকোচুরি খেলেন। ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা যেনতেনভাবে প্রতিবেদন দিয়ে পুরো টাকা হাতিয়ে নেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটার ক্ষেত্রে ছলচাতুরি করে অখ্যাত কোম্পানির নামে বেশি দামে নিম্নমানের পণ্য ক্রয় করে থাকেন। বিগত তিনটি ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত টাকার সামান্য কিছু অংশ ব্যয় করে বাকী সমস্ত টাকা পকেটস্থ করেছেন। ঢাকায় বসে ব্যাপকভাবে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছেন ভিসি মুহঃ রাশেদুল ইসলাম। তার লাগাতার অনুপস্থিতির কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম মরাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বাঁচাতে দুর্নীতিপরায়ণ ভাইস চ্যান্সেলরকে দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ। কুড়িগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সভাপতি রওশন আরা চৌধুরী বলেন, “আমরা সব সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে তাদের লোকজনই দুর্নীতি করে। তারা শুধু তাদের ভোল্ট পাল্টায়। ভিসি যে স্বজনপ্রীতি করেছেন সেটাও দুর্নীতি। তদন্ত সাপেক্ষে সরকার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিবে-এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। কোন ব্যক্তির কারণে সরকার কলঙ্কিত হোক এটা কারো কাম্য নয়।” এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক একাডেমিক চালু রাখার জন্য সম্পূর্ণ সাময়িক ভিত্তিতে যারা যোগ্য এবং অভিজ্ঞ প্রার্থী ছিল তাদেরকে নিয়োগ দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হবে। এ ব্যাপারে কথা হলে রংপুর বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক বলেন, “ভিসি কেন অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করবে? যেখানে এই এলাকার লোক অবহেলিত। এখানকার মানুষ চাকুরি পাবে না আর উনি স্বজনপ্রীতি করবে। এলাকার উন্নয়ন করবে না, নিজের মনমতো চালাবে এটা হতে পারে না। আমরা চাই এলাকার মানুষ যেন সুবিধা বঞ্চিত না হয় এবং কোন অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মানা হবে না।” এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

শেয়ার: