উত্তরকোণ

মাত্র ১০ মাসে উপজেলাকে সাজিয়ে এডিসি পদোন্নতি পেয়ে বিদায় নিলেন নন্দীগ্রামের জনবান্ধব ইউএনও শারমিন আরা

মাত্র ১০ মাসে উপজেলাকে সাজিয়ে এডিসি পদোন্নতি পেয়ে বিদায় নিলেন নন্দীগ্রামের জনবান্ধব ইউএনও শারমিন আরা

আব্দুর রউফ উজ্জল, নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ চোখে অশ্রু, মুখে স্নিগ্ধ হাসি—নন্দীগ্রামের মানুষের ভালোবাসা আর অসংখ্য স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বিদায় নিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আরা। মাত্র ১০ মাসের কর্মকাল। কিন্তু এই অল্প সময়েই সাধারণ মানুষের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন গভীর এক আত্মিক সম্পর্ক। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিকতা, আন্তরিকতা ও জনসেবার মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছিলেন নন্দীগ্রামবাসীর হৃদয়ে।২৪ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) দুপুর ১২টায় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন বিদায়ী ইউএনও শারমিন আরা। পদোন্নতি পেয়ে তিনি যশোর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলির আদেশ পেয়েছেন। দায়িত্ব হস্তান্তরের পর বিদায়ের মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। উপস্থিত সহকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকের চোখেও তখন পানি। দীর্ঘদিনের পরিচিত একজন আপনজনকে বিদায় দেওয়ার মতোই তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। বিদায়কালে অশ্রুসিক্ত নয়নে শারমিন আরা বলেন, ভালো থাকুক নন্দীগ্রাম উপজেলার প্রতিটি মানুষ। ১০ মাসের এই কর্মজীবনে আমার সবচেয়ে বড় সঞ্চয় আপনাদের ভালোবাসা। সরকারি চাকরিতে বদলির কারণে কোনো জায়গায় স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতি সারাজীবন সঙ্গে থাকে। তিনি আরও বলেন, নন্দীগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছেন, তা তিনি কখনো ভুলবেন না। নন্দীগ্রামে যোগদানের পর থেকেই উপজেলা পরিষদকে আরও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেন শারমিন আরা। উপজেলা পরিষদ চত্বরের প্রবেশপথ, রাস্তা সম্প্রসারণ, গাড়ির গ্যারেজ, বিভিন্ন অফিসকক্ষ সংস্কারসহ নানা উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেন তিনি। পরিষদ চত্বরে ঢুকলেই যেন মানুষের মনে প্রশান্তি আসে—এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেন তিনি। নিজের কর্মস্থলকে শুধু সরকারি অফিস হিসেবে নয়, বরং মানুষের সেবার একটি উন্মুক্ত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল তার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জোরদারে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে লাইট স্থাপন এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয় তার সময়ে। সরকারি দায়িত্বের গণ্ডির বাইরে মানবিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন শারমিন আরা। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহায়তা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়াসহ নানা মানবিক উদ্যোগে তাকে পাশে পেয়েছেন সাধারণ মানুষ। কোনো অসহায় মানুষের দুর্দশার খবর পেলেই তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গিয়ে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের দোরগোড়ায়। ফলে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নয়, অনেকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের একজন আপনজন। পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী ছিলেন তিনি। তার কর্মকালে তিনি সততা এবং নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায়, সরকারের খাল খনন কর্মসূচি শেষে অব্যয়িত ৬৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত প্রদানের মাধ্যমে । শুধু তাই নয় মাদক, জুয়া নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা রাস্তা, ড্রেনেজ, কালভার্ট, ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ নাগরিক নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন। শারমিন আরার বিদায়ের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে রাকিব নামে এক তরুণ বলেন, সরকারি রুটিন ওয়ার্কের মধ্যেও সাধারণ মানুষের মন জয় করা একজন মানবিক কর্মকর্তা ছিলেন শারমিন আরা। যোগদানের পর থেকেই সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি নিজেকে নিবেদন করেছেন। এ অল্প সময়ে তার কাজ নন্দীগ্রামের মানুষের মনে দাগ কেটেছে। অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইউএনওকে অনেক সময় উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে যেতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের জন্য তার কার্যালয়ের দরজা সত্যিকার অর্থেই উন্মুক্ত ছিল। বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় বগুড়া-০৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোশারফ হোসেনসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে শারমিন আরাকে বিদায় জানান। কেউ শুভকামনা জানিয়েছেন, কেউ স্মৃতিচারণ করেছেন, আবার কেউ আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেছেন। নন্দীগ্রামের মানুষের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, বিদায়ের মুহূর্তে সেটিই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলি যেখানে সাধারণ প্রশাসনিক ঘটনা, সেখানে শারমিন আরার বিদায় যেন হয়ে ওঠে নন্দীগ্রামবাসীর একজন আপন মানুষকে হারানোর মতো। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন শারমিন আরা। তিনি ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। কর্মজীবনের শুরুতে সহকারী কমিশনার হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। নন্দীগ্রামে যোগদানের আগে তিনি এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শারমিন আরা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও পরিচিতি লাভ করেন। নন্দীগ্রামে তার কর্মকাল হয়তো ছিল মাত্র অল্প সময় । কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই তিনি রেখে গেলেন অসংখ্য স্মৃতি। উপজেলা পরিষদ চত্বরের পরিবর্তন, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়দের সহায়তা, নাগরিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক আচরণ—সবকিছু মিলিয়ে তার বিদায়ের দিনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে একটি কথাই—“ভালো থাকবেন শারমিন আরা স্যার। নন্দীগ্রাম আপনাকে মনে রাখবে।” পদোন্নতি পেয়ে নতুন কর্মস্থল যশোরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি। নন্দীগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, নতুন কর্মস্থলেও তার মানবিকতা, সততা ও জনসেবার সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বিদায়ের মুহূর্তে নন্দীগ্রামবাসীর কণ্ঠে তাই ছিল একটাই শুভকামনা—সুখে থাকুন, সুস্থ থাকুন, নতুন কর্মস্থলেও মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যান শারমিন আরা।

শেয়ার: