উত্তরকোণ

৩৮ বছর কাটালেন যে স্কুলে, সেখানেই লাশ হয়ে ফিরলেন রনজিলা

৩৮ বছর কাটালেন যে স্কুলে, সেখানেই লাশ হয়ে ফিরলেন রনজিলা

স্টাফ রিপোটার: প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হতেন রনজিলা পারভীন। গন্তব্য ছিল গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলে পৌঁছেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে ধরতেন। কে পড়া শিখেছে, কে স্কুলে আসেনি, কার বাড়িতে কী সমস্যা, সবকিছুর খোঁজ রাখতেন তিনি। কিন্তু ৩০ আগস্ট রোববার সকালের দৃশ্য অন্যরকম! স্কুলে এলেন রনজিলা পারভীন, তবে সেই প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ভরা মানুষটি নয়। নিথর দেহ হয়ে, সাদা লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে। রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারানো রনজিলা পারভীন (৫৭) বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ ৩৮ বছর তিনি কাটিয়েছেন এই বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি আনাচে কানাচে তাঁর স্নেহ আর যত্নের স্পর্শ লেগে রয়েছে। ৩০ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে তাঁর মরদেহ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছালে প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবার দেখতে ছুটে আসেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও এলাকাবাসী। তাঁদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বিদ্যালয় চত্বর। প্রিয় শিক্ষিকাকে হারিয়ে ভেঙে পড়ে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, ‘আমাদের ম্যাডাম অনেক ভালো একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসতেন, খবর নিতেন। আমরা কেউ বিদ্যালয়ে না এলে তিনি বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতেন। আমাদের বৃত্তির জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। খুব ভালো পড়াতেন। ম্যাডাম আর আমাদের মাঝে নেই।’ শিক্ষার্থীর মুখের এই কথাগুলো যেন বলে দিচ্ছিল, একজন প্রধান শিক্ষক শুধু স্কুলের দায়িত্বই পালন করতেন না, তিনি ছিলেন শিশুদের কাছে একজন অভিভাবকও। নিহতের স্বজনেরা জানান, গত শুক্রবার রাত ১২টার বাসে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা পারভীন। শনিবার ভোরে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে পৌঁছান তাঁরা। সেখান থেকে ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রিকশায় ওঠেন রনজিলা ও তাঁর স্বামী। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে তাঁদের রিকশা পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে চলন্ত রিকশা থেকে পাকা সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, ‘ আমার চোখের চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম। অথচ আমি ঠিক থাকলাম, আর সে কিনা লাশ হয়ে ফিরে এল। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
নিহতের বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ কোন সভ্য দেশে এ ধরনের অসভ্য ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই হবে। এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ ১৯৮৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রনজিলা পারভীন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করতেন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেরিনা খাতুন বলেন, ‘কোমলমতিদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে তিনি সহজে ছুটি নিতে চাইতেন না। স্কুল ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সব সময় তাঁর চিন্তা ছিল।’ গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে রনজিলা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তিনি বলেন, ৩৮ বছর যে বিদ্যালয়ে শিশুদের পড়িয়েছেন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন, সেই বিদ্যালয়েই শেষবার ফিরলেন রনজিলা পারভীন। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল শিক্ষার্থীরা, কিন্তু তিনি ফিরলেন না ক্লাস নিতে। ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।’ ৩০ আগস্ট বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রনজিলা পারভীনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শ্বশুরবাড়ি দারাইল এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে তরফসরতাজ পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

 

শেয়ার: