মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) স্থাপন প্রকল্প এলাকায় নজিরবিহীন এক জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। কাগজে-কলমে থাকা প্রায় ৮ হাজার গাছের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব মিলছে না প্রকল্প এলাকায়। ভূমি অধিগ্রহণের নথি, নিলামে বিক্রি হওয়া গাছের সংখ্যা এবং বর্তমানে দৃশ্যমান গাছের হিসাবের মধ্যে আকাশ-পাতাল অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এই বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে বিস্তারিত হিসাব চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
মঙ্গলবার সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রামেবির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং প্রকল্প এলাকায় মোট কত গাছ ছিল, কত বিক্রি হয়েছে এবং বর্তমানে কত গাছ রয়েছেÑতার চুলচেরা বিশ্লেষণ জানতে চান। মন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পর উপাচার্য নিজেই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান। জেলা প্রশাসনের ২০২৩ সালের ১ জুনের ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত নথি এবং বাস্তব চিত্রের মধ্যে যে ব্যবধান, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
মোট গাছের সংখ্যা (অধিগ্রহণ নথি অনুযায়ী): ২৫,৮৪২টি
(এর মধ্যে ১৩,৯৬৩টি কলাগাছ এবং ১১,৮৭৯টি বিভিন্ন প্রজাতির কাঠজাতীয় ও ফলদ গাছ)
নিলামে বিক্রি হওয়া গাছ: ২,৬৪২টি (তিন দফায় মোট ২৬ লাখ ১২ হাজার৫৭০ টাকায় বিক্রি)
কাগজে-কলমে অবশিষ্ট থাকার কথা: ৯,২৩৭টি গাছ
বর্তমানে সরেজমিনে পাওয়া গেছে: ১,০০০টিরও কম গাছ!
উধাও হওয়া গাছের সংখ্যা: প্রায় ৮,০০০টি (যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা)।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নিলামের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে, অর্থাৎ টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্প এলাকায় চলে ব্যাপক গাছ কাটার মহোৎসব।
গত বছরের ২০ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গিয়েছিল, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অজুহাতে শত শত গাছ কেটে ট্রলিভর্তি করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। সে সময় কোনো নিলামই অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর গাছ কাটা সাময়িক বন্ধ হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে তড়িঘড়ি করে নিলাম কার্যক্রম শুরু করা হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, নিলামে বিক্রি হওয়া গাছ ছাড়া অন্য কোনো গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তিনি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের ফোন পাওয়ার পর আমি নিজেই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমার কাছেও মনে হয়েছে সেখানে প্রায় এক হাজারের মতো গাছ রয়েছে। বাকি গাছ কোথায় গেল, সেটি আমিও বুঝতে পারছি না। প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে উপসহকারী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণের টাকা বেশি তোলার জন্য গাছের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য অনেক সময় গাছের সংখ্যা বেশি দেখানো হয়। এখানেও তেমন কিছু হয়ে থাকতে পারে। শুরু থেকেই রামেবি স্থাপন প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অবকাঠামো নির্মাণ শুরুই করা যায়নি। বিশাল এই প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে কেবল প্রধান ফটক নির্মাণ ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এর মধ্যে এই গাছ গায়েব হওয়ার ঘটনা প্রকল্পটিকে নতুন করে বির্তকের মুখে ঠেলে দিল। স্থানীয় সচেতন মহল এই লুণ্ঠনের পেছনে জড়িত সিন্ডিকেটের বিচার দাবি করেছেন।
উত্তরকোণ
রামেবি প্রকল্প থেকে উধাও ৮ হাজার গাছ! উপাচার্যের অসহায়ত্ব প্রকাশ, ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী

