দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতিতে চাপে থাকা ব্যাংকিং খাত এখন আরও বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.২৬ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে ৩২ টাকার বেশি এখন আদায় অনিশ্চিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র পাওয়া গেছে। খাত-বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ অনেক ঋণ এখনো পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা আদালতের স্থগিতাদেশের আওতায় থাকায় সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। ফলে ঘোষিত খেলাপি ঋণের বাইরে আরও বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যাংক খাতে জমে আছে। এটি শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই বড় ধরনের সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও পরের প্রান্তিকে তা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আগেই উচ্চমাত্রায় ছিল। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে প্রায় ২৪.১৩ শতাংশ। গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। আর এখন মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এসব ব্যাংকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে। সব মিলিয়ে ওই সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হুঁ হুঁ করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে। ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বিশেষায়িত এবং দুর্বল ইসলামি ব্যাংকগুলোর ওপর। কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় ঋণ বিতরণ এবং পরে তা পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব ব্যাংকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ জামানত, প্রকল্প যাচাই বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই বড় ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এসব ঋণের বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি কমেছে ঋণ প্রবৃদ্ধিও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে নেমে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমেছে। শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। কৃষি ও উন্নয়ন খাতভিত্তিক এসব ব্যাংকের মধ্যে অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই লোকসান ও মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। অন্যদিকে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকে মালিকানা পরিবর্তন, অনিয়ম ও তারল্য সংকটের প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে এসব ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বড় শিল্পগ্রুপভিত্তিক ঋণে অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণে। নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু অনেক ব্যাংকই পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখতে পারছে না। ফলে মূলধন ঘাটতি বাড়ছে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যাচ্ছে, শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং নতুন মূলধন সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের মূল সমস্যা তারল্য নয়, বরং ‘আস্থা সংকট’। একদিকে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের কারণে নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এতে অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও মন্থর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উত্তরকোণ
খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে

