আওয়ামী লীগের শাসনামলে বছরের পর বছর লাগামহীন অনিয়মে বাংলাদেশের ব্যাংকিংখাত হিমশিম খাচ্ছে দুর্বল মূলধন নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকখাতজুড়ে মূলধন ঝুঁকি জনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) নেমে এসেছে মাত্র তিন দশমিক শূন্য আট শতাংশে। যেখানে আন্তর্জাতিক কাঠামো বাসেল থ্রি অনুযায়ী থাকা উচিত ন্যূনতম ১০ শতাংশ। তিন মাস আগেও এই হার ছিল ছয় দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের জুনে ছিল ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে বেশ কয়েকটি ব্যাংক পুঁজি ঘাটতিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। এর বেশিরভাগই পতিত সরকারের সময় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খারাপ ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঋণের টাকা ফেরত না আসায় প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যায়। এর ফলে মূলধন ঘাটতিও বহু গুণ বেড়ে যায়। ব্যাংকগুলোকে তাদের পরিচালন মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয় ঋণের বিপরীতে এবং এই প্রভিশন পর্যাপ্ত না হলে মূলধন ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ২০২৪ সালের শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকায়, যার প্রধান কারণ ছিল ৬৭ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার খারাপ ঋণ—যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৭২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের প্রধান ঋণখেলাপিদের মধ্যে রয়েছে আননটেক্স, ক্রিসেন্ট, বেক্সিমকো, থারম্যাক্স ও এস আলম গ্রুপ। তাদের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৮ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের চার হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি ছিল। এত বেশি মূলধন ঘাটতির কারণে একক ঋণগ্রহীতা সীমার আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখন বড় অংকের ঋণ দিতে পারছে না। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের ১২ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের নয় হাজার কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের সাত হাজার ৭০০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া, পদ্মা ব্যাংকের ঘাটতি চার হাজার ৯০০ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দুই হাজার ৯০০ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা।
উত্তরকোণ
পুঁজি সংকটে বিপর্যস্ত বেশ কয়েকটি ব্যাংক

