ইরানের সাথে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়াতে তেহরানের কাছে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে কাতার। তবে ইরানে আবারো হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করার ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান মিলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। দুবাই থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক গালফ নিউজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) জানায়, গত রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে শান্তি প্রস্তাবের খসড়া পৌঁছে দেন। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সপ্তাহের শেষ নাগাদ প্রস্তাবের বিষয়ে জবাব দিতে পারে ইরান। প্রস্তাবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাত দিনের একটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। এ সময় প্রতিদিনই উভয় পক্ষকে আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী সপ্তাহের শুরুতে এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। কয়েকটি দেশ চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেবে। তবে দেশগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, বুধবার সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাদের তা বলতে পারব না। তবে যেকোনো কিছুই সম্ভব।’ মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছে তিনি এ কথা বলেন। ট্রাম্পের দাবি, ইরান চুক্তি করতে চায়। তবে দেশটির নেতারা মার্কিন নির্বাচন পর্যন্ত আলোচনা পিছিয়ে দিতে পারেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁর বক্তব্য, আলোচনায় দেরি করলে ইরানের অবস্থার উন্নতি হবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছি। তাদের আর্থিক ব্যবস্থাও ধ্বংস করেছি। তাদের হাতে টাকা নেই। মূল্যস্ফীতি বিশ্বের সর্বোচ্চ, ৩০০ শতাংশ। সরকার শেষ। তবে দেখা যাক কী হয়।’অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বলেছেন, ট্রাম্পের সাথে মিলে ইরানের হুমকি ‘চিরতরে’ দূর করার বিরল সুযোগ পেয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ৬৬ শতাংশ ভোট গণনার পর দেখা যায়, নেতানিয়াহুর জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৫৪টি আসন পেতে পারে। সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। স্বতন্ত্র আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসন ১৮। সরকার গঠনে প্রয়োজন ৬১টি আসন। দুই পক্ষই সরকার গঠনের চেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে মতবিরোধ: হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও বিদেশি সামরিক উপস্থিতি নিয়ে বুধবার ইরান ও কাতারের মধ্যে প্রকাশ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মাহমুদ মালেকি বলেন, কাতারের উচিত সদিচ্ছার পরিচয় দেয়া এবং তেহরানের ভাষায় ‘আগ্রাসীরা’ যাতে দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এর আগে কাতারের গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক ইব্রাহিম সুলতান আল-হাশমি হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌ চলাচলের প্রতি সম্মান দেখাতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরাইলের উসকানিতে সামরিক অভিযান শুরু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। রাশিয়ায় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের সম্মেলনে বৈশ্বিক গ্যাস বাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আরাগচি বিদেশি সামরিক উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তেহরানে ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক বৈঠককে তিনি সংলাপ জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, স্থায়ী সহযোগিতার জন্য পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান ও বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশীরাই আমাদের অগ্রাধিকার।’এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ১৬টি দেশের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাজ্য। আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে ফ্লাইট বাতিল ও আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ভ্রমণকারীদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কাতারের প্রস্তাবে ইরানের জবাবের অপেক্ষায় এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এ প্রস্তাব আলোচনার পথ খুলবে, নাকি নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের পরিস্থিতির ওপর।

