মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: গত দুই দশকে রাজশাহীর নগরায়ণের চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন। তবে এই উন্নয়নের আড়ালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে নির্মিত হচ্ছে বহু ভবন, যেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের নেই রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ও ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন। ফলে এসব ভবন নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, দুই দশক আগে জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবনটিই ছিল রাজশাহীর একমাত্র ১০তলা ভবন। বর্তমানে নগরজুড়ে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্মাণবিধি ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মানা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাধারণত সাত তলার বেশি উচ্চতার ভবনকে বহুতল ভবন হিসেবে ধরা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ভবন মালিক সাত তলার অনুমোদন নিয়ে আট থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করছেন। এছাড়া সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না।
আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বর্তমানে বহুতল ভবনের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে ৮৪৮টি ভবন প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নগরবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, আরডিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। এতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হবে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, শুধু নোটিশ বা মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। আরডিএকে মাঠপর্যায়ে আরও কঠোর হতে হবে। নিয়মবহির্ভূত অংশ ভেঙে দিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার না করলে এই অনিয়ম বন্ধ হবে না।
আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল্লাহ আল তারিক জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মশিউর রহমান বলেন, অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ ও মামলা করার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে। তবে নিয়মবহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই।
আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে রাজশাহীর সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন এখন অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরকোণ
রাজশাহীতে অনুমোদনহীন বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি, ঝুঁকিতে নগরবাসী

