মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক পরিসরে বিস্ফোরণের মতো আবির্ভাব ঘটেছে একটি নতুন নামের— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। প্রথমে অনেকে এটিকে নিছক ব্যঙ্গ বা মিমভিত্তিক উদ্যোগ ভেবেছিলেন। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে এটি কেবল মজার কোনও পেজ নয়; বরং দেশের বেকার, হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভের ডিজিটাল বিস্ফোরণ। আর সেই ক্ষোভের কেন্দ্রে এখন সরাসরি নরেন্দ্র মোদী সরকার। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে প্রায় ১৪.৯ মিলিয়ন ফলোয়ার— যা ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে শুরু করে আমেরিকাতেও এই প্ল্যাটফর্ম ঘিরে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ একটাই, বহুদিন পর দেশের যুবসমাজ এমন একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে, যেখানে ভয় না পেয়ে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে। এই আন্দোলনের জন্মও হয়েছে এক গভীর অপমানবোধ থেকে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বেকার তরুণ-তরুণীদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যাখ্যা এলেও, দেশের লাখো বেকার যুবকের কাছে সেটি ছিল ক্ষমতাবানদের ঔদ্ধত্যের প্রতীক। আর সেই ক্ষোভই রূপ নেয় ‘Cockroach Janta Party’-তে— এমন এক ডিজিটাল প্রতিবাদে, যা আজ মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যুবসমাজের রাগ, হতাশা ও বিদ্রূপের ভাষা হয়ে উঠেছে। সিজেপি শুরু থেকেই একের পর এক ইস্যুতে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে। নিট কেলেঙ্কারি, বেকারত্ব, ভোটার তালিকা বিতর্ক, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির দুর্বল হয়ে পড়া, বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে প্রশ্ন— সব ক্ষেত্রেই তারা সরব। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদীকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘অলৌকিক নেতা’র ইমেজকে ব্যঙ্গ করে একের পর এক পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বিজেপির বিপুল আইটি সেলের মোকাবিলায় এটাই প্রথম বড় ডিজিটাল পাল্টা আঘাত, যা সরাসরি তরুণদের ভাষায় কথা বলছে। এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ ডিপকে। বয়স মাত্র ৩০। বর্তমানে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করলেও ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব তিনি। অতীতে আম আদমি পার্টির ডিজিটাল প্রচারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, এখন তিনি নিজেকে যুবসমাজের কণ্ঠস্বর হিসেবেই তুলে ধরছেন। তাঁর বক্তব্য, “আমরা করদাতাদের টাকায় প্রচার করতে আসিনি, আমরা প্রশ্ন করতে এসেছি।” আর সেই প্রশ্নই আজ মোদী সরকারের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি যে জাতীয়তাবাদী আবেগ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং বিশাল ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছিল, সিজেপি ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত হানছে। তারা বলছে— চাকরি কোথায়? শিক্ষাব্যবস্থা কেন ভেঙে পড়ছে? কেন তরুণদের কণ্ঠস্বরকে বারবার দেশদ্রোহ বা অরাজকতার তকমা দেওয়া হচ্ছে? কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইমেজ তৈরি করা হবে, অথচ বাস্তবে যুবকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকবে? সমালোচকদের অভিযোগ, সিজেপি শুধু বিজেপিকেই নিশানা করছে। কিন্তু পাল্টা যুক্তিও উঠে আসছে— বর্তমানে দেশের ক্ষমতায় বিজেপি, তাই সরকারের জবাবদিহি চাওয়াটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলগুলোর সীমাবদ্ধতা থাকলেও, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্র এখন বিজেপির হাতেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদের নাম জড়ানোয় বিতর্ক আরও বেড়েছে। বিজেপি সমর্থকরা এটিকে বিরোধীদের ‘গোপন ডিজিটাল এজেন্ডা’ বলতে শুরু করেছেন। তবে অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের অভিযোগ আসলে মূল ইস্যু থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা। কারণ প্রশ্নটা কোনও দলকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটা দেশের সেই তরুণদের নিয়ে, যারা ডিগ্রি নিয়েও চাকরি পাচ্ছেন না, যারা প্রশ্ন তুললেই ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’ তকমা পাচ্ছেন। সবশেষে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, সিজেপি প্রমাণ করে দিয়েছে যে ডিজিটাল দুনিয়ায় মোদী সরকারের একচেটিয়া আধিপত্যে এবার ফাটল ধরছে। এতদিন যে সোশ্যাল মিডিয়া মূলত বিজেপির প্রচারের শক্তিশালী অস্ত্র ছিল, এখন সেই একই জায়গা সরকারবিরোধী ক্ষোভের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কেবল ভাইরাল মিম আর ব্যঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই ভারতের ক্ষুব্ধ যুবসমাজের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নেয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট— দেশের তরুণদের একটা বড় অংশ আর শুধু প্রচার শুনতে রাজি নয়, তারা এবার জবাব চাইছে।
উত্তরকোণ
ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান; মহাবিপদে মোদি সরকার

