উত্তরকোণ

আইসিইউ সংকটে রাজশাহী মেডিকেলে শিশুমৃত্যু বাড়ছে; অভিভাবকদের আহাজারি

আইসিইউ সংকটে রাজশাহী মেডিকেলে শিশুমৃত্যু বাড়ছে; অভিভাবকদের আহাজারি

মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংকটের কারণে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে নাÑএমন অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে। আইসিইউতে স্থান না পাওয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের সেবার সক্ষমতা নিয়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক শিশুর বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার সন্তান ২১ দিন রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি ছিল। চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও দুই দিন অপেক্ষার পরও শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে ভর্তি করার পরই শিশুটি মারা যায়। তিনি অভিযোগ করেন, সময়মতো আইসিইউ পেলে হয়তো তার সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হতো। একই ধরনের ঘটনা ঘটে চার মাস বয়সী আনাসের ক্ষেত্রে। গত ১৩ মার্চ জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাকে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউতে গিয়ে তার বাবা দেখেন, আগে থেকেই ৩৮ জন শিশু অপেক্ষমাণ। দুই দিন অপেক্ষার পরও শয্যা না পেয়ে ১৫ মার্চ আনাস মারা যায়। মৃত্যুর দুই দিন পর ১৭ মার্চ হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয়, আইসিইউ শয্যা খালি হয়েছে। শিশুদের আইসিইউ সংকটের কারণে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেক পরিবার। রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার সাহিদের শিশুসন্তানও আইসিইউতে স্থান না পেয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তিনি জানান, তিন দিন চেষ্টা করেও সন্তানের জন্য আইসিইউ শয্যা জোগাড় করতে পারেননি। শনিবার বিকেলে হাসপাতালের শিশু আইসিইউ ইউনিটের সামনে গিয়ে দেখা যায়, উদ্বিগ্ন ও হতাশ অভিভাবকদের ভিড়। কেউ সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার চোখের পানি মুছতে মুছতে ওয়ার্ডে ফিরে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়ার মীরপুর থেকে আসা ১০ মাস বয়সী শিশু সাফোয়ানের পরিবার জানায়, শ্বাসকষ্ট ও হাম রোগে আক্রান্ত শিশুটির জন্য জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন হলেও বিকেল পর্যন্ত তারা জানতে পারেন, আগে থেকেই ৪১ জন শিশু অপেক্ষমাণ। অর্থাভাবে ঢাকায় নেওয়ার সুযোগও নেই বলে জানান শিশুটির বাবা। একইভাবে ৪২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা সাত মাস বয়সী মোজাহিদের পরিবারও চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। শিশুটির বাবা মোস্তাক হোসেন বলেন, এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর হয়তো তার সন্তানের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে না। রামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, গুরুতর ও সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। রাজশাহী মেডিকেলে ৬০ শয্যার আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মিত হলেও সরকারি অনুমোদন না থাকায় সব শয্যা চালু করা যায়নি। বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৪০টি শয্যায় সেবা দিচ্ছে, যার মধ্যে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি শয্যা রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ-উল-ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আইসিইউ কার্যক্রম সরকারি অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি না থাকায় সব শয্যা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আইসিইউ শয্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দিলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

শেয়ার: