ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম নয়, বরং এটি একটি ভাইরাস বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যার লক্ষণ সমাজের সর্বক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে বারবার বিপ্লব ফিরে আসবে। যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পরিণতিও ৭ নভেম্বরের মতো হতে পারে। আজ সকালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান জানান, ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য শুনতে শুনতেই তার জীবনের ৫৫ বছর কেটে গেছে। কিন্তু এ দিবস থেকে রাজনীতিবিদদের যে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, তারা সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহিদের বিদ্রোহের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে শেখ মুজিব বারবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কাজ করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ইসলামী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাহিনীটিকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে তারা ইচ্ছা করলেই কাউকে হত্যা করতে পারত, কোনো জবাবদিহি করতে হতো না। কোনো নারীকে ঘর থেকে তুলে আনলেও তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতো না। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোথায় সে?’ একজন মানুষকে বিনা বিচারে হত্যার পর প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বিচারব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা এবং অবিচারকে বৈধতা দেওয়ারই শামিল ছিল। শেখ মুজিবের শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘এক নেতার এক দেশ’ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। তার মানসিকতা ছিল, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তার অঙ্গুলি হেলনেই সূর্য উঠবে এবং অস্ত যাবে। অথচ সূর্য কারও অঙ্গুলি হেলনের অপেক্ষা করে না, নির্দিষ্ট সময়েই উদিত হয়। তৎকালীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমীর বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট করে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। জনগণের জন্য বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রীও যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষ কম্বল পায়নি। এ নিয়ে শেখ মুজিব নিজেও একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বিভিন্ন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের নেতারা সোনার খনি পেয়েছেন, আর তিনি পেয়েছেন চোরের খনি।তিনি আরও বলেন, লুটপাট, দুর্নীতি, মানুষের সম্মানহানি, বিনা বিচারে হত্যা এবং একদলীয় শাসনের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত হচ্ছিল। ক্ষমতাসীনরা আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। বাকশালের সংবিধানে শেখ মুজিব জীবিত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান থাকার বিধান রাখা হয়েছিল। এমনকি অসুস্থ বা অক্ষম হলেও দায়িত্বে থাকার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এটিকে জাতির সঙ্গে উপহাস এবং গণতন্ত্র নিয়ে তামাশা বলে অভিহিত করেন তিনি।
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জনসমর্থন: ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা, অপমান ও উপেক্ষা করার কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মূলত সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতেই সেদিনের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। শুরুতে এতে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের পরদিন শুক্রবার সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ বহাল থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে জুমার নামাজের জন্য তিন ঘণ্টা কারফিউ শিথিল করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে জামায়াত আমীর বলেন, ৭ নভেম্বরের পর তিনি পর্যায়ক্রমে প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিএনপি গঠন করেন। তবে ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখতে হবে।

