জানতেন না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী
এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে। গত ২৪ মার্চ তাকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে (২৮ মার্চ) তার নিয়োগ বাতিলে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে মো. আব্দুর রশীদ মিয়া’র নিয়োগ বাতিলের তথ্য জানানো হয়। ঈদের ছুটির পরে অফিস খোলার দিনে গত ২৪ মার্চ মঙ্গলবার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান- স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় সংস্থাটির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে। অথচ নিয়োগের বিষয়ে জানতেন না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্লিন ইমেজের অধিকারী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অথচ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর তার কাছেই বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এতে অত্যন্ত বিব্রত হন তিনি।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী পদ (চলতি দায়িত্ব) থেকে অবসরে যান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়া। সংশ্লিষ্ট পদে থাকাকালে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছিলো দুদক। এই কর্মকর্তাকেই হঠাৎ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। যেখানে সরকারের অন্যতম প্রধান কমিটমেন্ট হলো ‘দুর্নীতির টুটি চেপে’ ধরা অর্থাৎ দুর্নীতি দমন করা।
এই নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় সরকার খাত ছাড়াও প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সরকারের ভাবমুর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্লিন ইমেজের অধিকারী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঘুর্ণাক্ষরেও তিনি জানতেন না এই নিয়োগের আগাম কোনো তথ্য। অথচ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর তার কাছেই বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এতে অত্যন্ত বিব্রত হন তিনি। সরকারের উপরের মহলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেও জানা যায়। ফলে গোটা সরকারেই এ ঘটনায় ঝাঁকুনি হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিব্রত হন। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে নিয়োগের এই প্রজ্ঞাপন বাতিল হবে। রোববারই প্রজ্ঞাপনটি বাতিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অসংখ্যবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ‘যে কোনো মূল্যে’ ‘দুর্নীতির টুটি চেপে’ ধরা অর্থাৎ দুর্নীতি দমন করার। নির্বাচনের ইশতেহারে এ প্রতিশ্রুতির কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। নির্বাচনের পরেও তিনি একাধিক বক্তব্যে দুর্নীতি দমনের ‘প্রতিশ্রুতি পূরণ’র কথা বলেছেন। তারমধ্যেই ঘটলো এমন বড় ঘটনা! সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এ ব্যাপারে যথাযথ গোয়েন্দা তথ্যও তুলে ধরা হয়নি। পুরো বিষয়টিই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
নিয়ম হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রধানের নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তথ্যসহ সার-সংক্ষেপ যাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। তাতে মন্ত্রণালয় প্রধান অর্থাৎ মন্ত্রীর অনুমোদন থাকবে। কিন্তু জানা গেছে, মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়নি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তিনি জানতেনই না এ ধরনের কোনো নিয়োগের বিষয়ে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, এই পুরো বিষয়টিই সম্পন্ন হয়েছে একটি বিশেষ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিশেষ তৎপরতায়। যারা অবিশ্বাস্যভাবে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথমদিন থেকে হর্তাকর্তা হয়ে উঠেছেন। এই সিন্ডিকেটটি মূলতঃ পুরো সরকারকেই নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মূল হোতা হলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। এর সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পিএস মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী। বগুড়া-২ শিবগঞ্জ আসনের এমপি বর্তমান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রমতে, মীর শাহে আলম এ বিষয়টি আগাম জানতেন এবং তাঁর আনঅফিসিয়াল অনুমতিতেই নিয়োগের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ মিয়া সম্পর্কে ইতিবাচক ভুয়া তথ্য তুলে ধরে অত্যন্ত গোপনে সার-সংক্ষেপটি তৈরি করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিজ দপ্তরে বসেই সার-সংক্ষেপ তৈরি এবং তাতে জনপ্রশাসন সচিবের স্বাক্ষর নেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গেই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। পরের দিন বুধবার সচিবালয়ে এ ঘটনাটি ছিল ‘টক অব দ্যা সেক্রেটারিয়েট’। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন সারাদেশের দপ্তরগুলোয় ক্ষোভ-অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আব্দুর রশীদ মিয়া দূরে সরে থাকেন। যোগদানপত্র জমা দিতে মন্ত্রণালয়ে আসেননি। এলজিইডি-তেও যাননি। ইতিমধ্যে তিনি খবরও পেয়ে গেছেন, পদে বসা আর সম্ভব হচ্ছে না। নিয়োগ বাতিল হতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, আব্দুর রশীদ মিয়া ইতিপূর্বে সংস্থাটির মানবসম্পদ উন্নয়ন, মাননিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ ইউনিটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকাকালে ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান। ব্যাপকমাত্রায় দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের কারণে তাঁর এ নিয়োগটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ওই সময় তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্তও চলছিল দুদকের। তখনকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ২০ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর পদটি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। গণমাধ্যমে তখন এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। চাকরির বয়স শেষে ৩১ আগস্ট, ২০২৫ তিনি এই পদ থেকে অবসরে যান। এরপরে আরও দু’জন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন এবং জাবেদ করিম প্রধান প্রকৌশলী পদ (চলতি দায়িত্বে) থেকে অবসরে গেছেন। বর্তমানে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পদে আছেন মো. বেলাল হোসেন। তারমধ্যেই ঘটলো এমন অস্বাভাবিক ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে যে, মো. আব্দুর রশীদ মিয়া ৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে এখনকার এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাগিয়ে নিয়েছিলেন।
৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের তদন্ত চলমান:
২০২৩ সালে, যখন আব্দুর রশীদ মিয়া সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছিলেন, ওই সময় তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)-এ। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রাথমিক তদন্তেই এর সত্যতা পাওয়া যায়। দুর্নীতির অর্থে নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ ও ঢাকায় কিনেছেন জমি। বেনামে একাধিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন, বরুয়া মৌজায় তার নামে ক্রয়ে করেছেন ৭ কাঠা জমি, যার জার বাজার মূল্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা। মোহাম্মদপুরের শাজাহান রোডের ডি-ব্লকের হোল্ডিং নং ৩২/৩ এর ছয়তলা বাড়িটিও তার। ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে স্ত্রী ফাতেমা জাকিয়ার নামে ক্রয় করেছেন ফ্লাট। সিরাজগঞ্জের হাইওয়ে রাস্তার পাশে ৬০ কাঠা জায়গার উপর চালাচ্ছেন ফুড গার্ডেন নামে রেস্টুরেন্ট এবং তার পাশেই নিজ শ্যালকের নামে জমি ক্রয় করে দুইটি ৫তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। আব্দুর রশিদ তার নিজ গ্রাম কাজিপুর উপজেলায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কয়েক দফায় তাকে তলব করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। বরং, অভিযোগটি চাপা দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদে পদোন্নতি নেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। জানা যায়, দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান থাকার তথ্য গোপন করে ‘দুদকে কোনো অনুসন্ধান/তদন্ত চলমান নেই’-মর্মে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ও তাকে কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁয়াকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন পান।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, আব্দুর রশীদ মিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত এখনো চলমান আছে। দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে উল্লেখ আছে, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে আব্দুর রশিদ মিয়া অন্তত ৩০০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব সম্পদের বেশির ভাগই তিনি করেছেন স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়স্বজনের নামে। এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রশাসন ও ট্রেনিং বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি বেপরোয়া দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বও পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে থাকাকালে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অন্তত ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
সিন্ডিকেট বেপরোয়া:
এ রকমের চিহ্নিত শীর্ষ একজন দুর্নীতিবাজকেই এলজিইডির মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাও এই বিএনপি সরকারের আমলে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বার বারই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতি দমনের। সরকারকে এমন প্রশ্নের মুখের দাঁড় করিয়েছে যে সিন্ডিকেট, এর মূল হোতা হলেন মুখসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। এই আব্দুস সাত্তার ইতিপূর্বে অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরে যেসব বেপরোয়া অপকর্ম করেছেন তাতে বিএনপির ভাবমুর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। সচিবালয়সহ সরকারি দপ্তরগুলোয় এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে যিনি এ বি এম আব্দুস সাত্তারের দুর্নীতি-অপকর্মের খবর জানেন না। এমনকি সাধারণ সচেতন মহলেও এ খবরগুলো চাউর হয়ে আছে। তিনি এবং তার সহযোগীরা বিএনপির নাম ব্যবহার করেই এ লাগামহীন অপকর্মগুলো করেছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে রাজধানী ঢাকা শহরে বিএনপি ‘আশাতীত’ খারাপ ফলাফল করার পেছনে এটিও অন্যতম একটি কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যও অত্যন্ত নেতিবাচক। এ নিয়ে শীর্ষ নিউজ ডটকম-এ গত ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “স্বরাষ্ট্রের কোর কমিটির সভায় আব্দুস সাত্তারের কথা উঠতেই গোয়েন্দা প্রধানরা ক্ষেপে গেলেন কেন?” সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকালের দিন অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির এক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল। বৈঠকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে শীর্ষনিউজ ডটকম-এ ৮ জানুয়ারির ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি ছিল এই- “গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বিশেষ সভার আহ্বান করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভাটি আয়োজন করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর জানাজা ও দাফন কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। পাশাপাশি তারেক রহমানের ঢাকার বাইরে সম্ভাব্য সফরসহ সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল সভার কার্যসূচিতে। সভায় আলোচনার এক পর্যায়ে কোর কমিটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিএনপির তিন সদস্যের কমিটিতে বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের নাম উঠতেই ক্ষেপে যান গোয়েন্দা সংস্থাসমুহের প্রধানরা। আব্দুস সাত্তারকে বিএনপির এই কমিটিতে রাখা হলে গোয়েন্দা প্রধানরা কমিটিতে থাকবেন না বলে জানান। আব্দুস সাত্তারের বিষয়ে গোয়েন্দা প্রধানরা এতটা ক্ষুব্ধ কেন, এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গোয়েন্দা প্রধানরা আব্দুস সাত্তারের ব্যাপারে কেন এতটা নেতিবাচক তা তারা ব্যাখ্যা করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেগম খালেদা জিয়ার পিএস হিসেবে আব্দুস সাত্তারের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছে চরম নেতিবাচক তথ্য রয়েছে।”
“জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির নিয়মিত সভা প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি হয়ে থাকে। তবে নির্বাচন উপলক্ষ্যে প্রতি সপ্তাহেই এখন বৈঠক হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ওই দিনই জরুরিভাবে কোর কমিটির বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছিল। নানা কারণে তারেক রহমানের নিরাপত্তার ইস্যুটিও এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশে ফেরার পরে ঢাকার বাইরে সফরেরও পরিকল্পনা নেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে সফরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে অনেক। তাই এই ইস্যুটিও ছিলো কোর কমিটির আলোচনার এজেন্ডায়।”
“বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স- এসএসএফ। সভার শুরুতে এসএসএফ প্রধান সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেন। সভায় কোর কমিটির সদস্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবরা ছাড়াও তিন বাহিনী (সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী) প্রধানের প্রতিনিধিরা এবং এসএসএফ’র ডিজি, এনএসআই’র ডিজি, ডিজিএফআই’র ডিজি, এসবি প্রধান, ডিবি প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার আলোচনার এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, বিএনপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে। যাতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন সংশ্লিষ্ট কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করা যায়, পাশাপাশি তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা যায়। এই সময় সভায় উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই একজন কর্মকর্তা তিন সদস্যের কমিটিতে আব্দুস সাত্তারের নাম প্রস্তাব করেন এবং বলেন, কমিটির অন্য দু’জন সদস্য বিএনপি থেকে আব্দুস সাত্তারই নির্ধারণ করে নেবেন। আব্দুস সাত্তারের নাম প্রস্তাব করার সঙ্গে সঙ্গেই এসএসএফ, এনএসআই ও ডিজিএফআই প্রধানরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বলে জানা গেছে।”
“দেশের শীর্ষ এই গোয়েন্দা প্রধানরা বলেন, আব্দুস সাত্তারকে এই কমিটিতে রাখা হলে তারা থাকবেন না। আব্দুস সাত্তার সম্পর্কে তাদের একযোগে এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ঘটনায় উপস্থিত অনেকেই অবাক হন। তবে আব্দুস সাত্তারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। বিশেষ করে ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে এ পর্যন্ত আব্দুস সাত্তার ও তার সহযোগিরা যেসব বেপরোয়া অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন তা সচিবালয় ও সরকারি দপ্তরসমুহের কারোই অজানা নয়। এতে বিএনপির ভাবমুর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। এসব তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছেও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কেউ কেউ মনে করছেন, গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছে আব্দুস সাত্তার সম্পর্কে হয়তো আরও ভয়াবহ রকমের তথ্য রয়েছে। এ কারণেই গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের প্রধানরা তারেক রহমানের নিরাপত্তার কাজগুলোতে আব্দুস সাত্তারকে সম্পৃক্ত করতে চাইছেন না।”
“দেশের জাতীয় নির্বাচন সুচারূভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরলসভাবে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও এদের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। দেশের সামরিক বাহিনী নির্বাচন চায়, গণতন্ত্র চায়- এটা অতীতে কখনো বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি বিশ্বের অন্যত্রও কোথাও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের এখনকার সামরিক নেতৃত্ব এই নতুন নজির স্থাপন করতে চাইছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।”
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বিএনপি সরকার গঠনের পরেই ওই রাতে এ বি এম আব্দুস সাত্তার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব পদে নিয়োগ পান। এরপরেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদীকে, যিনি অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে আব্দুস সাত্তারের দুর্নীতি-অপকর্মের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। যদিও এই আশরাফ রেজা ফরিদীকে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে সাবেক শিবির ক্যাডার এবং প্রশাসনে জামায়াতের ‘গুপ্ত’ সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই দিনে ফরিদী নিজের অনুগত আরও দু’জন কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-১ পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেন। এই সিন্ডিকেটই সরকারের ভাবমুর্তি এবং জনমতের প্রতি তোয়াক্কা না করে নিজেদের স্বার্থে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিব পদে বহাল রাখা হয়েছে যথাক্রমে নাসিমুল গনি এবং এহসানুল হককে। যারা ইতিমধ্যে অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে দুর্নীতি, নানা অনিয়ম-অপকর্ম এবং বিএনপি বিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত। এই সিন্ডিকেটের সর্বশেষ ভয়াবহ অপকর্মের নজির হলো, শীর্ষ দুনীতিবাজ আব্দুর রশীদ মিয়াকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে অবশেষে সরকার নিয়োগটি বাতিল করতে যাচ্ছে। কিন্তু যা ক্ষতি হওয়ার সেটি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। সূত্র-primenewsbd.net

