মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে গত কয়েক বছরের তুলনায় বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। শুধু পাশের হারই নয়, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং সামগ্রিক ফলাফলের প্রায় সব সূচকেই নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। বোর্ডের সাত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালে পাশের হার নেমে এসেছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ৬১৩ জন শিক্ষার্থী।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাশের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২২ হাজার ৩২৭ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাশের হার কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, আর জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ জন। এর আগে ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৮ হাজার ৭৪ জন। ২০২৩ সালে পাশের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৬ হাজার ৮৭৭ জন। ২০২২ সালে পাশের হার ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ছিল সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ-৪২ হাজার ৫২৭ জন। ২০২১ সালে পাশের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, আর ২০২০ সালে ছিল ৯০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ বছরের ফলাফলেও মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ভালো করেছে। ২০২৬ সালে মেয়েদের পাশের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাশের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যেও মেয়েদের সংখ্যা বেশি। এ বছর ৮ হাজার ৯৯১ জন ছাত্রী এবং ৭ হাজার ৬২২ জন ছাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
এর আগের বছরগুলোতেও একই ধারা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে মেয়েদের পাশের হার ছিল ৮২ দশমিক ০১ শতাংশ, ছেলেদের ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে মেয়েদের পাশের হার ছিল ৯১ দশমিক ৯০ শতাংশ, ছেলেদের ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার শিক্ষার্থী। অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৯০৮ জন।
এর আগের বছর ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার, উপস্থিত ছিল প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার এবং অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৪৮২ জন। অন্যদিকে ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার, ২০২৩ সালে ২ লাখ ৬ হাজারের বেশি, ২০২২ সালে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার, ২০২১ সালে ২ লাখ ৮ হাজারের বেশি এবং ২০২০ সালে ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি। সাত বছরের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বছর ছিল ২০২২। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪২ হাজার ৫২৭ জন শিক্ষার্থী। পরের বছরই সেই সংখ্যা কমে ২৬ হাজার ৮৭৭-এ নেমে আসে।
২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ২৮ হাজার ৭৪, ২০২৫ সালে কমে ২২ হাজার ৩২৭ এবং ২০২৬ সালে আরও নেমে ১৬ হাজার ৬১৩-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ জন। আবার ২০২৪ সালের তুলনায় কমেছে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ জন। ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাতেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ২০২৬ সালে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ৩৫টি প্রতিষ্ঠান। অথচ ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৯, ২০২৪ সালে ২৮৯, ২০২৩ সালে ১৭৮, ২০২২ সালে ১৪৭, ২০২১ সালে ৩৯৮ এবং ২০২০ সালে ৩০৮। একই সঙ্গে এ বছর ৫টি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এছাড়া ১ থেকে ৫০ শতাংশ পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১টি। অথচ ২০২৫ সালে শূন্য কিংবা ৫০ শতাংশের নিচে ফল করা কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। ২০২৬ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৫৫ জন। এর মধ্যে উপস্থিত ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার শিক্ষার্থী এবং অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৮৪০ জন। নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পাস করেছে প্রায় ৯৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাত বছরের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দুর্বল ফলগুলোর একটি। পাশের হার, জিপিএ-৫, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা-সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের ফলাফলের এই পতন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করে পাঠদান, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তা না হলে আগামী বছরগুলোতেও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
উত্তরকোণ
রাজশাহী বোর্ডে এসএসসির ফলাফলে বড় ধস, সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশের হার
