মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: চলতি মৌসুমের শুরুতে রাজশাহীর হাট-বাজারে পাটের দাম ছিল চাঙা। এতে ভালো উৎপাদনের পাশাপাশি লাভের আশায় ছিলেন কৃষকরা। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানে হঠাৎ করেই পাটের বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। এতে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলার পাটচাষিরা। তাঁদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে পাট কেনা কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে পাট বিক্রি করতে হচ্ছে উৎপাদকদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পাটের দাম ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। উন্নত মানের পাটের সর্বোচ্চ দাম মিলছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ মৌসুমের শুরুতে একই মানের পাট প্রতি মণ প্রায় ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি প্রায় দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। গত বৃহস্পতিবার পবা উপজেলার বৃহৎ পাট মোকাম নওহাটা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা দরদাম করে পাট কিনে মজুত করছেন। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে ক্রেতা কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে। পবা উপজেলার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি-সবকিছুর খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারে আনা পর্যন্ত প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। এরপরও যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তাহলে আগামী বছর পাট চাষ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ পাটের ন্যায্যমূল্য অন্তত ৩ হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা হওয়া উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৮ থেকে ১০ মণ পাট উৎপাদন হয়। বর্তমানে গড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি আয় হয় ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার টাকা। অথচ শ্রমিকের মজুরি, নিড়ানি, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও পরিবহনসহ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ফলে সব খরচ বাদ দিলে লাভ থাকছে খুবই সামান্য। পাটখড়ি বিক্রি থেকে কিছু অতিরিক্ত আয় হলেও তা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য বলে জানান তাঁরা। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ৯৪ হেক্টর বেশি। এ বছর ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি। উৎপাদন বাড়লেও বাজারদর কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের দাবি, পাট সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং পাট রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি করা হলে তাঁরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। অন্যথায় আগামী মৌসুমে অনেকেই পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের ভাষ্য, পাটকলগুলোর নির্ধারিত মূল্য অনুসারেই তাঁরা পাট কিনছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানিকারী কয়েকটি দেশে চাহিদা কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম. এ. মান্নান বলেন, এবার পবায় পাটের উৎপাদন ও মান দুটোই ভালো হয়েছে। আগাম জাতের পাট কাটা শুরু হয়েছে। উন্নত মানের আঁশ পেতে পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত গভীর পানিতে পাট জাগ দেওয়া জরুরি। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কৃষকদের বড় ধরনের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা নেই।
তবে কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তাহলেই দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল পাটচাষে কৃষকদের আগ্রহ বজায় থাকবে।
উত্তরকোণ
রাজশাহীতে হঠাৎ পাটের দরপতন, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা
