রাণীনগর (নওগাঁ) : নওগাঁর রাণীনগরে কৃষি কর্মকর্তাদের অবহেলার কারনে ভেস্তে গেছে ক্লাস্টার অল্টারনেটিভ ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং বা পর্যায় ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) প্রযুক্তি প্রদর্শনী প্রকল্প। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় না করে ধানের কাঙ্খিত ফলন পেতে এমন প্রকল্প হাতে নিলেও প্রকল্পের কাজ এবং উদ্দেশ্য সর্ম্পকে জানতে না পারার কারনে একদিকে যেমন কৃষকরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অন্যদিকে সরকারের অর্থ অপচয় হয়েছে।
সংশ্লিষ্ঠ সুত্রে জানাগেছে, প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন,এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) এর আওতায় রাণীনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এই উপজেলায় ক্লাস্টার এডব্লিউডি প্রযুক্তি প্রদর্শনী প্রকল্পে মোট চারটি ব্লকে চারজন কৃষককে ২একর করে মোট ৮একর জমিতে এই প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। কৃষকরা বলছেন,গত ১৭ডিসেম্বর প্রদর্শনীর উপকরন হিসেবে প্রতি দুই একর জমি চাষের জন্য ২০কেজি ব্রি-ধান ১০২ জাতের ধান বীজ,ইউরিয়া সার ২বস্তা,ডিএপি সার ২বস্তা,পটাশ সার ২বস্তা,জৈব সার ২বস্তা,জীবসাম ৫০কেজি,দস্তা ৪কেজি,বরুন সার ৫কেজি ও কিটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই প্রদর্শনী দেখভালর জন্য কৃষি অফিস থেকে চারটি ব্লকে চারজন ফিল্ড সুপার ভাইজারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী উপজেলার জলকৈ গ্রামের শাহাদত আলীর ছেলে কৃষক কামরুল ইসলাম,চকবলরাম গ্রামের আব্দুস ছালামের ছেলে কৃষক ওসমান আলী,কালীগ্রাম কসবাপাড়া গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে কৃষক বাবু সরদার এবং আতাইকুলা গ্রামের লেদু সরদারের ছেলে কৃষক আমিনুল ইসলামকে এই প্রদর্শশনী দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ঠ তথ্যমতে, প্রতি দুই একর জমিতে ধান রোপনের ১২-১৫ দিনের মধ্যে জমির চারটি ধানের গোছার মাঝখানে এডব্লিউডি ১০ইঞ্চির ৬টি পিভিসি পাইপ স্থাপন করতে হবে। ১০ইঞ্চি পাইপের ৬ইঞ্চি ছিদ্রযুক্ত অংশ মাটির নিচে এবং ৪ইঞ্চি মাটির উপরে থাকবে। জমিতে একবার সেচ দেয়ার পর যতক্ষন পর্যন্ত পাইপের ভিতরের তলায় পানি দেখা যাবে ততক্ষন নতুন করে সেচের প্রয়োজন হবেনা। এভাবেই ধান রোপনের পর থেকে থোর আসা পর্যন্ত সেচ দিতে হবে। এছাড়া থোর আসার পর থেকে জমিতে হালকা পানি রাখতে হবে। এতে প্রায় ৩৫-৫০শতাংশ পর্যন্ত কম পানি সেচ দিয়ে কাঙ্খিত ফলনসহ ধান ঘরে তোলা যায়। এতে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কম হয়,অন্যদিকে ধানে রোগ বালাই রোধসহ ফলন ভাল পাওয়া যায়। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বদ্ধ করতে সরকার এমন উদ্যোগ নিলেও শুধুমাত্র কৃষকদের উপকরণ দিয়েই খ্যান্ত হয়ে পরেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষকরা বলছেন,জমিতে কিভাবে পাইপ স্থাপন করতে হয় বা কি নিয়মে পানি সেচ দিতে হয় কৃষি অফিস থেকে এসব কিছুই জানানো হয়নি। ফলে বরাবরের মতোই জমিতে সেচ দিয়ে ধান চাষ করছেন তারা।
রোববার সরেজমিন চকবলরাম গ্রামে গিয়ে কৃষক ওসমান আলীর সাথে কথা বলে জানা যায়,কৃষি অফিস থেকে অন্যান্য উপকরনের সাথে ১০ইঞ্চির ৬টি পাইপ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পাইপগুলো কিভাবে জমিতে বসাতে হবে তা জানা নেই। ফলে কাদার মধ্যে বসিয়ে রেখে আগের মতোই পানি সেচ দিয়ে ধান চাষ করছি।
কালীগ্রাম কসবাপড়া গ্রামের কৃষক বাবু সরদার,আতাইকুলা গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম এবং জলকৈ গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, প্রদর্শনীর বিভিন্ন উপকরণ পেয়েছি। কিন্তু পাইপ পাইনি। পাইপ দিয়ে কি কাজ হবে তাও জানা নেই। এছাড়া কেন,কি উদ্দেশ্যে এই প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে কৃষি অফিস থেকে বলা বা বোঝানো হয়নি। ফলে আগের মত করেই জমিতে ধান চাষ করছি।
এই তিনটি ব্লকের দায়িত্বে থাকা ব্লক সুপার ভাইজার সানারুল ইসলাম,ওয়াজেদ আলী এবং আফাজ উদ্দীন জানান,ওই সব কৃষকদের বার বার ফোন করেও আসেনি। ফলে পাইপগুলো এখনো আমাদের কাছেই আছে।
রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন সাংবাদিকদের নিকট থেকে এসব তথ্য জানতে পেরে দায়িত্বে থাকা ব্লক সুপার ভাইজারদের সাথে কথা বলে জানান, প্রদর্শনী সর্ম্পকিত অন্যান্য উপকরন দেয়া হলেও ব্লক সুপার ভাইজাররা পাইপ গুলো কৃষকের কাছে পৌছাইনি। তিনি বলেন,ব্লক সুপার ভাইজারদের অসহযোগিতার কারনেই কৃষকরা এমন সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন,এখানে শুধু ব্লক সুপার ভাইজারদের একার দায়িত্ব নয়,কৃষি কর্মকর্তা প্রতি সপ্তাহে বা ১৫দিন পরপর মিটিং করবেন এবং প্রদর্শনী মনিটরিং করবেন। এরপরেও কেন এই প্রকল্পের অবস্থা এরকম হলো তা সরেজমিন পরিদর্শণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।