মো. রাকিবুল ইসলাম, উত্তর ধরলা (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় ১০৮টির মধ্যে ৭০টি অবৈধ ইটভাটা। নাগেশ্বরী উপজেলার এগারোমাথা এলাকায় কৃষিজমি ঘেঁষে গড়ে তোলা পারস্পারিক অবৈধ ৫টি ইটভাটা। নাগেশ্বরীতে ২০টি মধ্যে ১৫টি অবৈধ ও ভূরুঙ্গামারীতে ৯টি মধ্যে ৩টি অবৈধ ইটভাটা। অপরদিকে নাগেশ্বরীর এগারোমাথায় রাতের আধাঁরে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অমান্য করে এএন ব্রিকস ও এনবি ব্রিকস ইটভাটা অবাধে দুই ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটছেন। এদিকে জেবিএল ব্রিকস ও টিএমএইচ ব্রিকস ইটভাটা ফসলি জমি থেকে অবাধে মাটি কাটছেন। কয়েকদিন পূর্বে এগারোমাথার জিএস ব্রিকস ইটভাটা ফসলি জমির মাটি কাটায় নাগেশ্বরী সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল ও জরিমানা করার পরেও অবাধে ফসলী জমির মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত জেলার ১৩টি ভাটায় অভিযান পরিচালনা করে ১২লাখ ১৫হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রাম। ১৬টি নদ-নদী বেষ্ঠিত, সীমান্ত ঘেঁষা ও সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল। ৯টি উপজেলা এবং ৩টি পৌরসভার প্রান্তিক চাষিরা বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলা করে জমিতে দুইবার ফসল চাষ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটান। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের আইন অমান্য করে কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় অবৈধ ইটভাটায় অবাধে ইট পোড়ানো হচ্ছে। কৃষিজমি ও লোকালয়ে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রহীন এসব ইটভাটায় বিপুল উৎসাহে ইট তৈরি করছেন। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কুড়িগ্রাম কার্যালয় সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলায় ইটভাটা রয়েছে ১০৮টি, যার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে ৩৮টির। বাকি ৭০টি ইটভাটার কোনো অনুমোদন নেই। এর মধ্যে নাগেশ্বরী, উলিপুর, কুড়িগ্রাম সদর, রৌমারী, ফুলবাড়ী, রাজারহাট, ভূরুঙ্গামারী, চিলমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় ১০৮টির মধ্যে ৭০টি অবৈধ ইটভাটা অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ওই সব ইটভাটার কোনোটির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। কখনোই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সংগ্রহ করেনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রহীন অবৈধ নাগেশ্বরী উপজেলার নেওয়াশী ইউনিয়নের এগারোমাথা সংলগ্ন জেবিএল ব্রিকস, টিএমএইচ ব্রিকস, জিএস ব্রিকস ও এএন ব্রিকস, এনবি ব্রিকস এবং সন্তোষপুর ইউনিয়নের আলেমের তেপতি এলাকায় মেসার্স ডিএব্রিকস, এজেপি, ব্রিকস, এমএসবি ব্রিকস, এমবিবি ব্রিকস, ভিতরবন্দ ইউনিয়নের চন্ডিপুর এলাকায় কেজিপি ব্রিকস, ভিতরবন্দ ডিগ্রী কলেজ সংলগ চৌধুরী ব্রিকস কৃষিজমি ও লোকালয়ে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) অনুযায়ী এই অভিযান পরিচালনা করে উলিপুরের রঘুরার এলাকার মেসার্স এসএম ব্রিকসে ১লাখ ৭০হাজার, মেসার্স এনএম ব্রিকসকে ১লাখ ৫০হাজার, ফুলবাড়ী উপজেলার কে এম ব্রিকসকে ৫০হাজার, ডব্লিউ এ এইচ ব্রিকসকে ১লাখ ৫০হাজার টাকা ও এবি ব্রিকস এবং এম এস এইচ ব্রিকসকে ২লাখ টাকা ও নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দের মেসার্স এস এস ফোর ব্রিকসকে ২৫হাজার, এগারমাথায় মেসার্স এইচ টি ব্রিকসকে ৩০হাজার ও মেসার্স এ এন ব্রিকসকে ৪০হাজার টাকা এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মেসার্স টি এম এচ ব্রিকস ইটভাটায় ১লক্ষ টাকা, পাইকেরছড়ার মেসার্স মুন ট্রেডার্স ইটভাটায় ১লক্ষ টাকা ও গছিডাঙ্গার মেসার্স ফ্রেন্ডস ট্রেডার্স ইটভাটায় ১লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ না থাকায় ভাটাগুলোর কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে ১০৮টির মধ্যে ৭০টি অবৈধ ইটভাটা আংশিক গুঁড়িয়ে দিয়ে সিলগালা করে দেয়। ইটভাটার মালিককে নভেম্বর মাসের মধ্যে ইটভাটা সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা দেয়। ইট ভাটার মালিক উচ্চ আদালত থেকে তিন মাসের অনুমতি নিয়ে ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে জোরেশোরে ইট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইটভাটার মালিক নজরুল ইসলাম, আনজু মিয়াসহ অনেকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর, কাস্টম সহ বিভিন্ন জায়গায় অর্থ দিয়ে ভাটায় ইট পুড়ানো হচ্ছে। আপনার লিখলে জরিমানা হবে। আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে আদালতের দেওয়া তিন মাসের সময়ের মধ্যে তারা ভাটা কার্যক্রম শেষ করতে পারবেন না। নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শারমিন জাহান লুনা বলেন, উপজেলায় অবৈধ ইটভাটায়গুলোয় ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার দায়ে জেল দেয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির বলছেন, ভাটার কিলনের ভিতর ইট। মাঠে ইট। এ অবস্থায় ভাটা বন্ধ করলে মালিকরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। আদালত যে তিন মাস সময় দিয়েছে সেই সময়ের মধ্যে আমরা ভাটার কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা করবো। কুড়িগ্রাম পরিবেশ অধিপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, সীমিত সাধ্যের মধ্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়ার পর আবারও চালু করছে। আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ইট ভাটাগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক নুর আলম বলেন, কুড়িগ্রামের অবৈধ ইট ভাটাগুলো আদালতে রিট করে তিন মাস চালানোর কাগজ দিয়ে এসেছেন। অভিযোগ পেলে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।