ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কথিত ‘গ্রেপ্তার’ নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটল।ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা শনিবার দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি ও এর নেতার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং কংগ্রেসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ঠেকানোর জন্য প্রশাসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সমর্থন করেছেন। পাঠকদের জন্য কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হলো। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব: ‘ট্রাম্পের অবৈধ ও উসকানি ছাড়াই ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্টকে অপহরণ আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন। এগুলো একটি বেপরোয়া রাষ্ট্রের কাজ,’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন তালাইব। তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকান জনগণ বিদেশে আরেকটি সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ চায় না।’ সিনেটর অ্যান্ডি কিম: ডেমোক্র্যাট এই সিনেটর অভিযোগ করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত মাসে সিনেট ব্রিফিংয়ে আইনপ্রণেতাদের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। তারা তখন বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সৃষ্টি অভিযানের উদ্দেশ্য সরকার পরিবর্তন নয়। ‘আমি তখনই তাদের বিশ্বাস করিনি, আর এখন আমরা দেখছি তারা কংগ্রেসের কাছে নির্লজ্জভাবে মিথ্যা বলেছেন,’ কিম এক্স এ লেখেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প সশস্ত্র সংঘাতে জড়ানোর জন্য সংবিধান অনুযায়ী যে অনুমোদন প্রয়োজন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ প্রশাসন জানে—আমেরিকান জনগণ বিপুলভাবে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি প্রত্যাখ্যান করে।’ কিম আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা ‘শক্তির প্রতীক নয়’ এবং এটি ‘সুস্থ পররাষ্ট্রনীতি’ও নয়। ‘এটি ভেনেজুয়েলা ও গোটা অঞ্চলে থাকা আমেরিকানদের ঝুঁকিতে ফেলে এবং বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী নেতাদের কাছে একটি ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক বার্তা পাঠায়—যে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্যবস্তু করা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নীতি।’ কংগ্রেসওম্যান বেটি ম্যাককলাম: ম্যাককলাম, যিনি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস সাবকমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট, ট্রাম্পকে অবিলম্বে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আজ ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো স্পষ্টতই অবৈধ।” তিনি আরও বলেন, “ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি নয়, এবং কংগ্রেস এই অঞ্চলে শক্তি প্রয়োগের কোনো অনুমোদন দেয়নি।” তিনি রিপাবলিকান হাউস স্পিকার মাইক জনসনকে আহ্বান জানান, এই “নিয়ন্ত্রণহীন প্রেসিডেন্টকে লাগাম পরাতে” অবিলম্বে প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন পুনরায় ডাকার জন্য।ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গালেগো: “এই যুদ্ধ অবৈধ। এক বছরেরও কম সময়ে আমরা বিশ্ব পুলিশের ভূমিকা থেকে বিশ্ব মস্তানে পরিণত হয়েছি—এটা লজ্জাজনক। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো কারণ আমাদের নেই।” ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভর্ন: ম্যাকগভর্ন কংগ্রেসের নজরদারির অভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং অধিকাংশ আমেরিকানের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা সত্ত্বেও, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর একটি অযৌক্তিক ও অবৈধ হামলা চালিয়েছেন।” এক্স-এ তিনি আরও লেখেন, “তিনি বলেন আমেরিকানদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নেই—কিন্তু যুদ্ধের জন্য নাকি সীমাহীন অর্থ আছে??”রিপাবলিকান হাউস স্পিকার মাইক জনসন: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতা জনসন ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে “আমেরিকান জীবন রক্ষার জন্য একটি সিদ্ধান্তমূলক ও ন্যায্য অভিযান” বলে স্বাগত জানান। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি: লি, যিনি আগে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সৃষ্টির নীতির সমালোচনা করেছিলেন, বলেন যে রুবিও তাকে জানিয়েছেন—মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে “ফৌজদারি অভিযোগে বিচার মুখোমুখি করার জন্য” গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স: মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, নিকোলাস মাদুরোকে “গ্রেপ্তার” করার অভিযান প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প “তিনি যা বলেন, তা বাস্তবায়ন করেন”। শনিবারের হামলার আগে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল ওয়াশিংটনের সম্পত্তি। তারা দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির তেল শিল্প জাতীয়করণকে মিথ্যাভাবে `চুরি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে ভ্যান্স সেইসব বিশেষজ্ঞ, বিশ্বনেতা ও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রতিও মন্তব্য করেন, যারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রশাসনের পদক্ষেপকে অবৈধ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আর যারা বলছেন এটি ‘অবৈধ’—সবার জন্য একটি বার্তা: মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নার্কো-সন্ত্রাসবাদের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কারাকাসের প্রাসাদে থাকলেই যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অপরাধ থেকে কেউ বিচার এড়াতে পারে না।” সূত্র: আল-জাজিরা।