শাহীন রহমান, পাবনা: পাবনার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের শানিকদিয়ার মন্ডল মোড় কাঁচা বাজার। ভোরের আলো না ফুটতইে জেগে ওঠে এই বাজার। চরাঞ্চলের আশেপাশের অন্তত ১০ গ্রাম থেকে প্রতিদিন ভোর রাত থেকে সকাল অবধি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত প্রায় ২০ লাখ টাকার বিভিন্ন রকম সবজি বাজারে আনেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই বাজারে আসতে সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা। একটু বৃষ্টি হলেই কাদার নদী পারি দিয়ে ফসল বাজারে আনতে সীমাহীন দুর্ভোগ কৃষকদের। এতে সঠিক সময়ে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বাজারে না আসতে পারায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। এছাড়া সড়কের দুর্দশার কারণে রোগী নিয়ে সঠিক সময়ে হাসপাতালে না যেতে পারায় ঘটছে দুর্ঘটনা। আশঙ্কাজনক হারে বিদ্যালয়ে কমছে শিক্ষার্থী। এ সকল সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত এ সড়কটি পাকাকরণের দাবি এলাকাবাসীর। সরেজমিনে দেখা যায়, হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর, ভগীরথপুর, রতনপুর, জয়েনপুর, বোয়ালগাড়ী ও ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের কয়েকটি সহ অন্তত ১০টি গ্রামের ধূ ধূ চরের বালিতে কৃষকের শ্রমে ঘামে ফলেছে সবুজ সতেজ সবজি। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কলাবাগান ও সবুজ সবজি। সম্প্রতি এসব অঞ্চলের পদ্মার চরে এমন সবুজ বিপ্লবে বদলে গেছে এসব এলাকার কৃষি অর্থনীতি। এক সময়ের পতিত জমিগুলোতেই এখন সবুজ হাসি। মরিচ, কলা, কুমড়া, লাউকুমড়া, ঝিঙে, ধুন্দল, কড়লা, মিষ্টিকুমড়া ও মুলা সহ বিভিন্ন সবিজর আবাদ এখানে। এসকল সবজি মন্ডল মোড় বাজারে নিতে হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ভগীরথপুর থেকে ভুইড়ির ছাম মোড় পর্যন্ত সাড়ে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার কাচা সড়ক হয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই সড়কেরই এখন বেহাল দশা। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলছেন, এই বাজার থেকে ট্রাক ভরে পাইকার ব্যাপারীরা এসব সবজি কিনে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান। বাইরের জেলার ব্যাপারীরা এই বাজার থেকে কাচামাল কেনায় কৃষকদের ভালো দাম পাবার কথা থাকলেও তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেহাল সড়ক। সামান্য বৃষ্টিতেই কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত কাদাপানি বাধে। ফলে মাঠ থেকে তোলা ফসল ভ্যান বা মহিষের গাড়িতে আনাও দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে পড়ে। এবড়ো থেবড়ো পথে গুণতে হয় বাড়তি ভাড়া। বাধ্য হয়ে ঝাকি বোঝাই ফসল কয়েক কিলোমিটার বয়ে বাজারে নিতে সীমাহীন দুর্ভোগ তাদের। শ্রমিক ও পরিবহণ সংকটে অনেক সময় ক্ষেতেই নষ্ট হয় কষ্টের
ফসল। ভগীরথপুর গ্রামের কৃষক জফির মাঝি বলেন, শুধু পদ্মার চর থেকেই প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার সবজি বাজারে যায়। নদীটুকু নৌকায় এলেও এখান থেকে বাজারে নেবার উপায় নেই। মাথায় করে দফায় দফায় বাজারে নিতে হয়। ওই রাস্তাটুকু যদি পাকা করে দিতো তাহলে কৃষকদের সবচেয়ে বেশি উপকার হতো। ভবানীপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, রাস্তা খারাপ হওয়ায় মাথায় করে সবজি বাজারে আনতে দেরি হয়ে গেছে। এজন্য এখন ব্যাপারীরা তেমন মাল টানতেছে না। এখন নেবে কম দামে। তিনি বলেন, পদ্মার ওই চর ও এই চর মিলিয়ে হাজার হাজার বিঘা জমিতে দেখবেন খালি সবজি আর সবজি। এগুলোর যদি সঠিক মূল্য পাওয়া যেতো তবে কৃষকদের ভাগ্যই বদলে যেতো। রাস্তার জন্য সেটি আর হচ্ছে না। আবাদ করে শান্তি নাই, সবজি বাজারে আনতে শান্তি নাই। এই রাস্তার জন্য চলাফেরা করে বা কোনোভাবেই শান্তি নাই। ভগীরথপুর গ্রামের আরেক কৃষক হাসান আলী বলেন, গাড়িতে করে মাল (সবজি) কি আনবো ভাই, হেঁটে চলার মত উপায়ই তো নাই। এবড়ো থেবড়ো যাই থাক শুকনা সময়ে তবুও ৫০টাকার জায়গায় ১০০ টাকা দিলে এক ঝাকি সবজি নিতে ভ্যান পাওয়া যায়। কিন্তু বৃষ্টি হলে ৫০০ টাকাতেও সেটা পাওয়া সম্ভব না। স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোক্তার হোসেন বলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তাকিয়ে দেখেন চারপাশে শুধু সবুজ সবজির খেত। এদের ভোগান্তির শেষ নেই। শুধু এই কুষকদের ভোগান্তি নয়। একটা রোগী সঠিক সময়ে হসপাতালে নেয়া যায় না। বিশেষ করে ডেলিভারি রোগী নিয়ে কি যে বিপাকে পড়তে হয় এখানকার মানুষদের। বাচ্চা ও মায়ের সাথে প্রায়ই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় স্কুলে উপস্থিতি কমছে। বিশেষ করে মেয়েদের উপস্থিতি খুবই কম। এতে করে বাল্যবিবাহ বাড়ছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করতে গেলে এই এলাকায় সবার আগে একটি পাকা সড়ক প্রয়োজন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনা বিএডিসি’র সহকারী প্রকৌশলী আফনান আজম রুদ্র বলেন, ‘ওই এলাকাগুলোতে ব্যাপক পরিমাণে সবজি সহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের আবাদ হয়ে থাকে বলে জেনেছি। সড়ক না থাকায় কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলেও জেনেছি। এসব জানার পর আমাদের যে আগামী প্রকল্প পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে এই সড়কটি রাখার চিন্তা করেছি। অনুমোদন পেলে সড়ক নির্মাণ করা হবে।’