মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: পদ্মানদীতে নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে কোটি কোটি টাকার পোনা মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলো নদীর জীববৈচিত্র্য এবং জেলেদের ভবিষ্যৎ জীবিকার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর এলাকার এক জেলের জালে ২২ কেজি পাঙ্গাস মাছের ছোট ছোট পোনা ধরা পড়ে। এই মাছ মাত্র ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন তিনি। অথচ এই পোনাগুলো তিন মাস পর পরিপক্ক হলে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হতে পারত। এ ঘটনাটি পদ্মায় কারেন্ট জালের ভয়াবহতার একটি চিত্র মাত্র।
রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা, মতিহার, বোয়ালিয়া, রাজপাড়া, পবা, গোদাগাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ থানার হাজার হাজার জেলে প্রতিদিন নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার করছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব জালের প্রায় ৯০ শতাংশই পোনা মাছ ধরছে। এই সব মাছ আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পরিপক্ক হতে পারত। এই পোনা মাছগুলো রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারগুলো সয়লাব করে দিয়েছে। স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা জানান, প্রশাসনের নজরদারীর অভাবে জেলেরা নির্বিঘ্নে কারেন্ট জালে মাছ ধরছেন। গোদাগাড়ীর রেলবাজার এলাকার এক জেলের সর্দার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা কোনোভাবেই কারেন্ট জালকে নিরুৎসাহিত করতে পারছি না। বরং পদ্মায় দিনের পর দিন এ জালের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখন অন্তত ৯০ ভাগ জেলেই কারেন্ট জালে মাছ শিকার করছেন। তিনি আরও বলেন, যদি তিন মাস পোনা মাছ ধরা বন্ধ রাখা যেত, তাহলে প্রতিটি জেলেই তিন মাস পরে একেকদিন অন্তত ১০ হাজার টাকার মাছ ধরতে পারত। কিন্তু জেলেদের লোভের কারণে বিপুল পরিমাণ পোনা মাছ এখনই জালে আটকা পড়ছে। এবার পদ্মায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি স্থির থাকায় বিপুল পরিমাণ ডিম ছেড়েছে মা মাছ। ফলে গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ পোনার দেখা মিলছে। কিন্তু কারেন্ট জালের কারণে এই পোনাগুলো অকালেই ধরা পড়ছে, এতে নদীর জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পিরিজপুর এলাকার জেলে নজরুল ইসলাম বলেন, কারেন্ট জালওয়ালারা পোনা মাছ মেরে সাবাড় করে দিচ্ছে। এতেআমরা সাধারণ জাল দিয়ে মাছ শিকারীরাা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। গোদাগাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওহিদুজ্জামান এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এবার পদ্মায় পানি প্রায় দুই মাস ধরে স্থির ছিল। এতে করে সব ধরনের মা মাছ ডিম পাড়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে গত ১০-১২ দিন ধরে পানি নামতে শুরু করেছে। এতে করে মাছও বেশি ধরা পড়ছে। বিশেষ করে কারেন্ট জালে পোনা মাছই বেশি ধরা পড়ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা অভিযান চালাচ্ছি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। একদিকে গেলে আরেকদিকে কারেন্ট জাল পড়ছে। আমাদের রাতদিন নদীতে পাহারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্য জেলেদের সচেতন হওয়া দরকার। কিন্তু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার জেলেরা নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই করছে। পদ্মার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জেলেদের ভবিষ্যৎ জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে জেলেদের কারেন্ট জালের ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।