মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রেলবাজার সরকারি খাদ্য গুদামে নিম্নমানের চাল মজুদের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া সিদ্ধ চালের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গুদামে মজুদকৃত চালে খুদ, বড় ও ছোট ভাঙা দানা, চালের গুঁড়া, মরা চাল, বিজাতীয় পদার্থ, ভিন্ন জাতের মিশ্রণ, অর্ধসিদ্ধ চালসহ বিকট গন্ধ বিদ্যমান। বিনির্দেশ অনুযায়ী মিশ্রণের যে পরিমাণ থাকার কথা, তার চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি মিশ্রণ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কামাল অটো রাইস মিল, হাসেম অটো রাইস মিল ও আজিজ অটো রাইস মিলের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধ চালের আর্দ্রতা ১৪%, বড় ভাঙা দানা ৬%, ছোট ভাঙা দানা ২%, ভিন্ন জাতের মিশ্রণ ৮%, বিনষ্ট দানা ০.৫%, মরা দানা ০.৫%, বিবর্ণ দানা ০.৫% (প্রতি কেজিতে ১টি ধান), বিজাতীয় পদার্থ ০.৩%, খুদিময় দানা ০% এবং অর্ধসিদ্ধ দানা ১% থাকার কথা। কিন্তু গুদামে মজুদকৃত চালে খুদিময় দানা, অর্ধসিদ্ধ দানা, বড় ভাঙা দানা, ছোট ভাঙা দানা, ভিন্ন জাতের মিশ্রণ, বিনষ্ট দানা, মরা দানা ও বিবর্ণ দানাই ভরপুর দেখা গেছে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে গুদাম ঘরে সংরক্ষিত চাল ও গম দেখতে চাইলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) মোহাম্মদ আলী জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া চাল-গম দেখতে বা ছবি তুলতে নিষেধ করেন। এমনকি গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতিক্রমে দেখতে চাইলেও তিনি মোবাইল ছাড়া একজন সাংবাদিককে প্রবেশের অনুমতি দেন। তবে কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যাবে না বলে জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর ডিলার সাইফুল ইসলামের কাছে ৫০৯ বস্তায় ১৫ হাজার ২৭০ কেজি চাল হস্তান্তর করা হয়। এসময় অন্যত্র ট্রলি, ট্রাক এবং ট্রাক্টরে করে চাল সরিয়ে নিতেও দেখা গেছে। নিরাপত্তা প্রহরী মনিরুজ্জামান জানান, একটি ট্রাক লোড দিয়ে পাঠানো হয়েছে এবং আরেকটি ট্রাক কিছুক্ষণের মধ্যেই আসবে বলে জানান।
ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা (এলএসডি) নাজমুল আলম উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া চালের মান দেখাতে অস্বীকার করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদকে ফোন করলে তিনি জানান, তারা গুদাম পরিদর্শন করে ভালো চাল পেয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী রিপোর্টও পাঠিয়েছেন। তবে চাল দেখতে চাইলে আবেদন জমা দিতে হবে বলে জানান তিনি। আবেদন করে প্রসেসিংয়ে দেরি হলে চাল অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কার কথা জানালে ইউএনও কিছু চালের নমুনা নিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু চালের নমুনা নিতে গেলে নাজমুল আলম খুদ মিশ্রিত চাল নিতে বাধা দেন এবং অন্য কিছু চাল দিয়ে সেগুলো নিয়ে যেতে বলেন। ইউএনও ফয়সাল আহমেদ চালের নমুনা নিয়ে আর্দ্রতা পরীক্ষা করেন, যেখানে ১৩.৮% আর্দ্রতা পাওয়া যায়। তবে খুদিময় দানা, অর্ধসিদ্ধ দানা, বড় ভাঙা দানা, ছোট ভাঙা দানা, ভিন্ন জাতের মিশ্রণ, বিনষ্ট দানা, মরা দানা এবং বিবর্ণ দানার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) মোহাম্মদ আলী জানান, গুদামে ১১ টন গম এবং ৫ হাজার টন চাল মজুত আছে। এসব চাল দেখতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগবে।
উল্লেখ্য, এর আগে জেলার দুটি উপজেলার পাঁচটি সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করা হয়েছিল হাজার বস্তা খাওয়ার অনুপযোগী চাল। গত ২৬ আগস্ট দুর্গাপুর খাদ্য গুদামে রক্ষিত ১৩২ বস্তা খাওয়ার অনুপযোগী পচা চাল জব্দ করেন ইউএনও। এছাড়াও গত ৪ সেপ্টেম্বর ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের চারটি সংরক্ষণাগারে অভিযান পরিচালনা করে ইউএনও চারটি খাদ্য গুদামই সিলগালা করে দেন। গোদাগাড়ী খাদ্য গুদামের এই অনিয়ম গরীবের খাদ্য সুরক্ষায় গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের এই লুকোচুরি এবং অসহযোগিতা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।