অতীতের মতো আর বিভক্তি-বিভাজনের রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে আরো উন্নত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’ বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে একটা নতুন করে কথা উঠছে, ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশে এখানে এক ধরনের উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই উগ্রবাদকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়া যাবে না। তাহলে আমাদের বাংলাদেশের আত্মা, অস্তিত্ব রক্ষা পাবে না। এই কথাটা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে। বিভক্তি-বিভাজনের রাজনীতি কেউ করবেন না, অতীতে যা হয়েছে। এখন বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য, বাংলাদেশের সামনে নেয়ার জন্য, বাংলাদেশ আরো উন্নত করবার জন্য আমাদেরকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা বাংলাদেশে বাস করি, কী হিন্দু, কী মুসলমান, কী বৌদ্ধ, কী খ্রিস্টান, কী বিএনপি, কী শিবির, কী আওয়ামী লীগ— আমরা সবাই বন্ধু, এই দেশের নাগরিক। সেই নাগরিক হিসেবেই আমরা সকলেই সকলের একেবারে বন্ধু। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত ১৫ বছর যারা আমাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ভোট নিয়ে আমাদেরকে শাসন করেছেন, তারা এই ১৫ বছর আমাদেরকে বন্ধু হিসেবে মনে করেননি, মনে করেছেন প্রজা হিসেবে। আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে, নিপীড়ন করেছে, আমাদের সমস্ত দেশের সম্পদকে লুণ্ঠন করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।’ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি আমার বন্ধুদের কাছে শুনলাম, ব্যাংককের সবচাইতে অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ি ভাড়ার ধুম পড়ে গেছে। সেই বাড়িগুলো ভাড়া করছেন সমস্ত আওয়ামী লীগের বিতাড়িত নেতৃবৃন্দ। এবং তারা একটা যে গাড়ি কিনছেন সেই গাড়িগুলো কোনোটাই দুই কোটি টাকার কমে নয়। এটা কোত্থেকে গেল?’ ‘এ দেশের সম্পদ আওয়ামী লীগ পাচার করেছে। আপনারা সবাই জানেন, এটা নতুন করে বলার নাই। শুধু এইটুকু বলতে চাই, আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক যে কাঠামো সে কাঠামো ভেঙে ধ্বংস করে দিয়েছে, আওয়ামী লীগ এদেশের সম্পদকে লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে , প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে। আমাদের সম্পদ বলতে কিছু নেই, সব পাচার হয়ে গেছে,’ বলেন মির্জা ফখরুল। একজন অর্থনীতিবিদের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একজন অর্থনীতিবিদ জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘দেখে শুনে তো মনে হচ্ছে, এর পরে তোমরাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবে। জনগণ তোমাদের ওপর আস্থা রাখবে। তো তোমরা দেশ চালাবে কোত্থেকে? কারণ টাকা তো সব পাচার হয়ে গেছে।’ অর্থাৎ আমাদের দেশের অর্থনীতির অবস্থা কি করুণ করেছে, সেই জিনিসটাই শুধু আমি আপনাদেরকে বললাম।” একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বারবার চাই, এইজন্য চাই যে ১৯৭১ সাল আমাকে একটা স্বাধীন দেশ দিয়েছিল, ভূখণ্ড দিয়েছিল। আমাদেরকে আমাকে একটা স্বাধীন সত্তা দিয়েছিল। এবং সেই জন্যে আজকে আমার অস্তিত্ব আছে, আমি টিকে আছি। আমি স্মরণ করতে চাই চব্বিশের জুলাই-আগস্টের শহীদদেরকে, কারণ তারা আমাদেরকে একটা নতুন একটা গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এই দুটো জিনিস কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’ ‘আজকে একটা প্রচণ্ড প্রচেষ্টা চলছে একাত্তরকে ভুলিয়ে দেয়ার। এটার বিরুদ্ধে কিন্তু আমাদেরকে, সমস্ত বাংলাদেশের নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট যেভাবে সত্য, ঠিক একইভাবে সত্য কিন্তু একাত্তরের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা।’ বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকে যদি এই জন্মাষ্টমীকে স্মরণ করা সার্থক হবে, তখনই সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশে আমরা একটা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি। যদি আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি। যদি আমরা মানুষের অধিকারগুলোকে করতে পারি। ন্যায়বিচার, সাম্য এবং সকলের প্রতি সুবিচার যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ হবে ভবিষ্যতে।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশে শুধু নয়, পাক-ভারতের উপমহাদেশে সবসময় সাম্প্রদায়িকতাকে একটা অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করা হয়। রাজনৈতিক কারণে সেখান থেকে উঠে আসতে হবে, আমাদেরকে সেখান থেকে সকলকে উঠে এসে সকল সম্প্রদায় এক হয়ে এই দেশ ও মাতৃকাকে ভালোবাসতে হবে। এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যে দেশ অর্থ-সম্পদে সমৃদ্ধ হবে। বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। বাংলাদেশে আমরা সত্যের প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোকে প্রাধান্য দিতে পারব। এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের এই মহান দিনটিকে স্মরণ করবার সবচেয়ে উত্তম পন্থা।’