ওয়াশিংটন নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে তার নীতিকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই ভারতীয় পণ্য আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলেছে ট্রাম্পের ‘সেকেন্ডারি শুল্ক’। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য ভারতকে দেওয়া অতিরিক্ত শাস্তিকে ‘সেকেন্ডারি শুল্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরসঙ্গে নিষেধাজ্ঞার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্য কারো খারাপ আচরণে সহায়তা করার অভিযোগে তৃতীয় কোন পক্ষের ওপর ‘সেকেন্ডারি’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যদি কোনো মার্কিন ব্যাংক, বন্দর, জাহাজ বা কোম্পানিকে রাশিয়ার আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে লেনদেনে জড়িত হতে নিষেধ করা হয়, তাহলে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় অন্যদেশের জন্যও তা অবৈধ হতে পারে। নয়াদিল্লির এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শাস্তিমূলক করের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বাধ্য করা। যদি সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে রাশিয়া থেকে সমুদ্রগামী অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা ভারতকে নিয়ে হোয়াইট হাউজ কী করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভারত রাশিয়া থেকে সমুদ্রগামী অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা, যা ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে। শুল্কের ছদ্মবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ট্রাম্পের উদ্ভাবনী পদক্ষেপ মাত্র। আরো প্রচলিত একটি হাতিয়ার হলো ‘বিশেষভাবে মনোনীত বা নিষিদ্ধ ব্যক্তির’ তালিকা, যা যুক্তরোষ্ট্রের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় তেল পরিশোধক কোম্পানিগুলো এরইমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা বন্ধ করে দিচ্ছে। যদি নিষিদ্ধ ব্যক্তির তালিকা বা এসডিএন তালিকায় তাদের নাম ওঠে, তাহলে তাদের সাথে ব্যবসা করা অন্যদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। জাতীয়তাবাদী কোনো চাপই এই হুমকির ভয়াবহতা কমাতে পারবে না। মার্কিন মুদ্রা বা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অ্যাক্সেস হারানো ৫০ শতাংশ শুল্কের চেয়ে অনেক বড় ধাক্কা হবে। এমনকি ভারতীয় ধনকুবেররাও ট্রাম্পকে খোঁচাতে চাইবেন না। চলতি বছর মুকেশ আম্বানির তেল পরিশোধনাগারের জন্য রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ছিলো জ্বালাণির সবচেয়ে বড় উৎস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিলিয়নিয়ার গৌতম আদানির সঙ্গে তেলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মার্কিন সরকারের সঙ্গে তার আইনি ঝামেলা রয়েছে। তার সুরক্ষার জন্য একটি বিশাল বন্দর নেটওয়ার্কও রয়েছে। তাহলে উপায় কী? রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা, যাকে ৫০ শতাংশ জরিমানা শুল্কের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তিনি একটি কাজ করেছেন; আর তাহলো শুল্কের বিষয়ে যৌথ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ব্রিকস । বৃহস্পতিবার লুলার সাথে প্রায় এক ঘন্টা ফোনে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। চলতি আগস্ট মাসে সাত বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মোদির চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের বাড়াবাড়ি চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন লুলার জন্য যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে; ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়ানো মোদির জন্য মোটেও সুখকর হবে না। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলো চীন, যার সঙ্গে তাদের ৪৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাজিল, রাশিয়া এবং চীন এই তিন দেশে ভারতের মোট রপ্তানি বছরে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে প্রায় তিনগুণ বেশি জিনিসপত্র কিনে, প্রতি বছর ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের জন্য কয়েক হাজার কাজের ভিসাও প্রদান করে। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, আমলা, ধনকুবের এবং ব্যাংকারদের সন্তানদের জন্য স্টুডেন্ট-ভিসাও নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াশিংটন। মোদি ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘর্ষের পথে যেতে চাইলেও, ভারতীয় অভিজাতরা তাকে সমর্থন দেবে না। টিম মোদিকে অবশ্যই তাদের মনোযোগ পরিবর্তন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল তা এখন নিরঙ্কুশ মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের অনেক বড় খেলায় পরিণত হয়েছে। ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা করতে এখন কোনো সুযোগ নেই। বরং একে একটি বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসাবে পরিচালনা করা যেতে পারে। ট্রাম্পের দেওয়া তিন সপ্তাহের বাড়তি সময়ে ‘সেকেন্ডারি ট্যাক্স’ বাতিল করার বিষয়ে আরো মনোযোগী হওয়া জরুরি। মোদী যদি সেই সীমিত লক্ষ্যে সফলও হন, তারপরও তার রাজনৈতিক বিরোধীরা তাকে বিজয়ের পথে হাঁটতে দেবে বলে মনে হয় না। ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধি সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ভারতবাসীকে লক্ষ্য করে লিখেছেন, ‘বারবার হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী মোদি কেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছেন না; তার কারণ হলো আদানির বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন তদন্ত।’ তিনি আরো বলেন, মোদি দু’টি ‘এ’-এর মধ্যে আটকা পড়েছেন। এই দু’টি ‘এ’ বলতে তিনি আদানি ও আম্বানিকে বুঝিয়েছেন। রাহুল গান্ধি এরআগেও আম্বানি এবং আদানির বিশাল অর্থনৈতিক আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সৌরশক্তি চুক্তিতে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ প্রকল্পে জড়িত থাকার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আদানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। আদানি গ্রুপ এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা আইন অনুযায়ী সবকিছু করেছে। জুনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, আদানির কোম্পানি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরানের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি ভারতে আমদানি করেছে কিনা এ বিষয়ে তদন্ত করেছে মার্কিন প্রসিকিউটররা। এটাও অস্বীকার করেছে আদানি গ্রুপ। মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটের ব্যবসায়ী গৌতম আদানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। তবে এজন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো বাড়তি সুবিধা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন আদানি।
মোদি সাধারণত দেশের ভেতরে আদানির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেন না। এরআগে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মোদি এই ধনকুবেরের আইনি ঝামেলাকে ‘ব্যক্তিগত’ বিষয় বলে বর্ণনা করেছিলেন। চলতি সপ্তাহে, আদানি বন্দর ব্যবসার নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে এসেছেন; যা ইসরাইলের হাইফা টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইউরোপে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কোম্পানিটি বলছে, কর্পোরেট গভর্নেন্সের নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করতেই, আদানিকে আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা কর্মীদের মধ্যে রাখা হচ্ছে না। এটা ছিলো দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। বহির্বিশ্বে ক্ষমতা দেখানোর জন্যই ট্রাম্প এই ‘সেকেন্ডারি শুল্ক’ আরোপের হুমকি দেন। আম্বানি তেল-শোধনাগার ব্যবসা রাশিয়া থেকে সরিয়ে অন্যদেশে স্থানান্তর করতে চাইছে। ডব্লিউএসজে অনুসারে, তার একটি ইউনিট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিয়েল-এস্টেট ফার্মকে ১০ মিলিয়ন ডলার উন্নয়ন ফি প্রদান করেছে। অন্য কোনো বিকল্প নেই। বাণিজ্য বিরোধ এখনো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে, ক্ষমতাই একমাত্র আইন এবং মার্কিন ডলারই একমাত্র মুদ্রা। লুলা এবং মোদির মতো ব্যক্তিরা যত খুশি প্রথমটির প্রতিবাদ করতে পারেন; তবে তাদের দেশের কোনো বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীর পক্ষে দ্বিতীয়টির প্রতিবাদ করা ছাড়া আর উপায় নেই।