মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: ‘দালাল’। শব্দটি রাজশাহীর চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও পরিচিত শব্দ। দালালদের উৎপাত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালসহ সরকারি চিকিৎসা সেবায় অন্যতম একটি অন্তরাই। নগরীর বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অদৃশ্য মদদেই উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি এই দালাল চক্রের। এবার ওষুধ বিক্রীকারী ফার্মেসীগুলোও দালাল নিয়োগ দিয়েছে। যাদের কৌশলের কাছে অসহায় সাধারণ রোগীসহ স্থানীয় প্রশাসনও! এরা এখন চিকিৎসা সেবায় ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠছে। রাজশাহীতে স্যালাইন নিয়ে এই সিন্ডিকেটের নব কৌশলের কাছে রীতিমতো ধরাশয়ী সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর মার্কেট সাপ্লাই চেইনসহ স্থানীয় প্রশাসন।
স্যালাইন নিয়ে কয়েক সপ্তাহের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাজারে ৬৫ থেকে ১০০ টাকার এপিএনসহ সাধারণ স্যালাইন বিক্রি হয়েছে ৭০০ থেকে ১২’শ টাকা পর্যন্ত। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে আসলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসনও। কিন্তু নড়েচড়ে বসা পদপেও ধরাশায়ী হয়েছে দালাল ও অসাধু ফার্মেসী মালিকদের নব-কৌশলের কাছে। এখনো বাজারে স্যালাইনের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে নি তারা।
অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, বাজারে এপিএন স্যালাইনসহ নরমাল অন্য স্যালাইনগুলোর মৌসুমি চাহিদাকে টার্গেট করে পূর্ব প্রস্তুতি ছিলো কিছু অসাধু ফার্মেসী মালিকদের। তাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে দালাল চক্র। এদের দৌরাত্ম্যের কারণে স্যালাইনের সাধারণ সমস্যা এখন বড় সংকটে রুপ নিয়েছে। ফার্মেসীতে স্যালাইন বিক্রি না করলেও দালালদের মাধ্যমে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি করা হচ্ছে স্যালাইন। কৃত্রিম সংকট তৈরি ও গুজব ছড়িয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিলেও এই সিন্ডিকেটকে এখনো চিহ্নিতই করতে পারে নি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো।
‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’- কায়দাতেই সফল এ চক্র। আর এই দালাল চক্রের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মচারীসহ কিছু ফার্মেসী মালিক-কর্মচারী। আর নানা গল্প-গুজব, কল্প-কাহিনী ও একে অন্যের প্রতি অভিযোগেই সীমাবদ্ধ এই সিন্ডিকেট রুখার পদপে! অথচ পকেট কাটা যাচ্ছে রোগীদের। আর ওষুধ প্রশাসন এখনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্বই খুঁজে পায় নি! উল্টো দুষছেন সাধারণ রোগীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্যালাইন সরবরাহকারী কোম্পানির ইনচার্জ জানান, স্যালাইন নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই একটি সিন্ডিকেট সাধারণ রোগীদের পকেট কাটছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগী ও শিশুরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। স্যালাইন মার্কেটে দেয়ার কিছুণ পরই উধাও হয়ে যাচ্ছে।
তিনি নিজে স্যালাইন কোম্পানির ইনচার্জ হওয়ার পরেও ৮৭ টাকার স্যালাইন বাজার থেকে ২৫০ টাকায় কিনে নিজের আত্মীয়কে দিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, কোম্পানির কোন প্রতিনিধিই ১ পিস স্যালাইনও ফার্মেসীগুলোর বাইরে বিক্রি করতে পারবে না। এেেত্র নিজের প্রয়োজনেও ওই ফার্মেসী থেকেই স্যালাইন কিনতে হয়। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বাজারে সংকট থাকতোই, তাহলে স্যালাইন পাওয়াই যেতো না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ৬৫, ৮০, ১০০ টাকা দামের স্যালাইন ৭০০ থেকে ১২’শ টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং এটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি গোষ্ঠী সুবিধা নিচ্ছে এটা স্পষ্ট।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোঃ ফরিদুল ইসলাম বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থীতিশীলের মাধ্যমে ফায়দা লুটার মানসিকতা এখন উদ্বেগজনক হারে নিত্যপ্রয়োজনীয় থেকে শুরু করে সকল েেত্রই হচ্ছে। সিন্ডিকেটের নীতি-নৈতিকতার এতোটাই অধ:পতন হয়েছে যে বাচ্চাদের সাল্যাইন নিয়েও সংকট তৈরি করছে। এখানে কার্যকর মনিটরিংয়েরও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ দিকে নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, রাজশাহীতে ৭-৮টি কোম্পানি এপিএন স্যালাইন সরবরাহ করে থাকে। এ কোম্পানিগুলোর ডিপোগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লিবরা ইনফিউশন কোম্পানি ছাড়া অন্য কোম্পানিগুলো অন্য সময়ের মতোই স্যালাইনের সরবরাহ দিয়েছেন। কয়েকটি কোম্পানি সংকটকালীন বাড়তি সরবরাহও নিশ্চিত করেছেন। এরপরও অস্থীতিশীল স্যালাইনের বাজার!
তবে ফার্মেসীগুলোতে চলছে ভিন্ন ভিন্ন অজুহাত। কখনো সংকটের নানা কল্প-কাহিনী বানিয়ে স্যালাইন নেই বলে ফেরত দেয়া হচ্ছে। আবার কখনও দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। তবে যারা স্যালাইন না পেয়ে ফেরত যাচ্ছেন, কিছুদূর যেতেই দালালের কাছে বাড়তি দামেই পেয়ে যাচ্ছে স্যালাইন। তবে কোন স্যালাইন বিক্রেতায় ‘ বিক্রয় রশিদ’ দিচেছন না।
রাজশাহীর নগরীর বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি আমার সন্তানকে নিয়ে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে ডাক্তার এপিএন স্যালাইন কিনতে বলে। হাসপাতালের এটার সরবরাহ ছিলো না। লক্ষ্মীপুরের সকল ফার্মেসী খুঁজে না পেয়ে এক দালালের মাধ্যমে ৬৫ টাকার স্যালাইন ৭০০ টাকায় কিনেছি।
গত সপ্তাহে এই সিন্ডিকেট চেইনের কয়েকজনকে আটক করে রাজশাহী ড্রাগস অ্যান্ড কেমিস্ট সমিতি ও লক্ষ্মীপুর পুলিশ ফাঁড়ি। যেখানে ৮০ টাকার স্যালাইন বিভিন্ন হাত ঘুরে ১২’শ টাকায় রোগীর স্বজনের কাছে বিক্রি করে এই চক্রের সদস্যরা। সেখানে অপরাধীরা দোষ স্বীকার করে মা চাওয়ায় আইনগত কোন ব্যবস্থা না নিয়ে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজশাহী ড্রাগস অ্যান্ড কেমিস্ট সমিতির সহ-সভাপতি শামিম হোসেন জানান, সংকটের কারণে কিছু কিছু ফার্মেসীতে দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। কিন্তু ৮০-১০০ টাকার স্যালাইন ১২’শ টাকা এটা ফার্সেমিতে নেয়া হচ্ছে না। তবে দালালদের মাধ্যমে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে।
ওষুধ প্রশাসন রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মাখনুম তাবাসসুম জানান, কোন রোগী এখন পর্যন্ত তাদেরকে অভিযোগ করেননি। তবে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তারাসহ স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দফায় দফায় মিটিং করেছেন। আর স্যালাইনের কিছু সংকট রয়েছে। তবে সবার সঙ্গে সমন্বয় করে তা দূর করা হচ্ছে। এসময় স্যালাইনের বাড়তি দামের বিষয়ে সাধারণ রোগীদের সচেতন হওয়ার কথা বলেন তিনি।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহম্মদ জানান, হাসপাতালে স্যালাইনের কিছু সংকট ছিলো। তবে এখন এটা স্বাভাবিক।