বগুড়ায় শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক দফা দাবিতে বিএনপির পদযাত্রাকালে পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একাধিক স্কুলছাত্রী, পুলিশ সদস্য ও বিএনপি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের ছোড়া টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় ইয়াকুবিয়া স্কুলের ২৭ জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বেলা এগারোটায় বিএনপির নেতাকর্মীরা দুই অংশে ভাগ হয়ে পদযাত্রা শুরু করে। শহরের উত্তরপ্রান্ত মাটিডালি এলাকা থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার নেতৃত্বে এক অংশ অপর অংশ দক্ষিণ বনানী এলাকা থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনার নেতৃত্বে পদযাত্রা শুরু হয়ে শহরে প্রবেশ করে। পদযাত্রা যখন শহরের ইয়াকুবিয়া মোড়ে আসে তখন পুলিশ তাদের মূল শহর সাতমাথায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এতে কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ছুড়তে থাকে পুলিশের দিকে। পরে পুলিশ কিছুটা পিছু হটলে পদযাত্রাটি পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। তখন পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে নেতাকর্মীরা ইট ছুড়তে থাকে পুলিশের দিকে। পরে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গুলি ছোড়া শুরু করে। তখন নেতাকর্মীরা পিছু হটে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি, টিয়ার শেল ছুড়েছে। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পদযাত্রাকালে ইয়াকুবিয়া স্কুল মোড় থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রায় ঘন্টা ব্যাপী সংঘর্ষে পুরো শহর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুর রশিদ বলেন, পুলিশ কোন ধরনের উস্কানি বা বাঁধা দেয়নি বিএনপির পদযাত্রায়। কিন্তু হঠাৎ তাদের নেতাকর্মীরা পুলিশের উপর আক্রম করে। এতে পুলিশের ছয় সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। পুলিশ আকাশের দিকে গুলি ছুড়েছে। এজন্য তাদের কেউ আহত হয়নি।

সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসক শফিক আমিন কাজল জানান, ইয়াকুবিয়া স্কুলের ২৭ জন ছাত্রী তাদের হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। তবে অবস্থা গুরুতর নয়। শঙ্কার কিছু নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা চলছে।
সংঘর্ষের পর বিএনপি নেতাকর্মীরা শহরের নবাববাড়ি রোডে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয়। পরে সেখানেও পুলিশের সঙ্গে কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়। এই সময় পুলিশ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের দিকে এগিয়ে গেলে আবাও সংঘর্ষ হয়।
এদিকে, পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ‘শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা’য় অংশ নিতে আসা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শহরের সাতমাথায় লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নেয় । ঘটনার পর থেকে বগুড়া শহরজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখা হয়েছে।
বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূর আলম সিদ্দিকী রিগ্যান বলেন, ‘বনানী থেকে পদযাত্রা ইয়াকুবিয়া মোড়ে আসার পরে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নষ্ট করতে পুলিশ এমন করেছে। আমাদের অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ৬ থেকে ৮ জনকে আটক করা হয়েছে।’ বিএনপি কার্যালয় থেকে হাত বোমা নিক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকে এরকম কিছু ঘটেনি।’ শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক দফা দাবিতে আজ বগুড়ায় পৃথক দুটি পদযাত্রা করে বিএনপি। জেলা বিএনপির উদ্যোগে শহরের মাটিডালি বিমানমোড় ও বনানী মোড় থেকে পৃথকভাবে এই পদযাত্রা শুরু হয়। মাটিডালি থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপি সভাপতি ও বগুড়া পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা। আর বনানী মোড় এলাকা থেকে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনা।
ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: শাহাদৎ হোসেন জানান, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর স্কুলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘মূলত আতঙ্ক আর টিয়ার শেলের ধোঁয়ার কারণেই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারো কারো শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।’ দুপুর ৩টার দিকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসিইউয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন বাবা-মায়েরা অপেক্ষা করছেন।
খবর পেয়ে বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শফিউল আজম, বিএমএ বগুড়ার সভাপতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু, সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. রেজাউল আলম জুয়েল, স্বাচিপ বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক ডা. সামির হোসেন মিশু, ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা রফি নেওয়াজ খান রবিন এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেখতে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে যান। পরে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা ও সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনার নেতৃত্বে দলের সিনিয়র নেতারা অসুস্থ শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন।