রাতুল সরকার, রাজশাহী: রাজশাহী অঞ্চল এক সময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবখানেই বিএনপি সমর্থিত বা মনোনীত প্রার্থীদের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য ও দাপট। কিন্তু ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে রাজশাহীতে বড় ধাক্কা খায় বিএনপি। ওই সময় থেকে এ অঞ্চলে কঠিন সময় পার করছে দলটি রাজনৈতিকভাবে একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে এক সময়ের দাপুটে এই দলটি। এরপর সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে একের পর এক মামলা, গ্রেফতার আর দলীয় কোন্দলে এখন রাজশাহীতে অনেকটায় নিস্তেজ বিএনপি। কর্মসূচি দিলেও থাকে না আগের সেই জৌলুস। ফলে গত ১৪ বছরে স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন কোনোটিতেই আর তেমন সফলতার মুখ দেখেনি দলটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী দলটির গণসমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য এসেছে। রাজশাহীতেও নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ। গণসমাবেশের এই আয়োজন রাজশাহীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা।
সমাবেশকে সফল করতে এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা। ব্যাপক লোকসমাগমের টার্গেটে মাঠে নেমেছে দলটি। প্রতিদিনই নেতাকর্মীরা গণসংযোগ, প্রচার মিছিল, মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ নানা কাজে অংশ নিচ্ছেন। গণসমাবেশে উপস্থিতি বাড়াতে গোটা বিভাগজুড়েই নেতাকর্মীরা প্রচারকাজে একযোগে নেমেছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা গণসমাবেশের সার্বিক প্রস্তুতি তদারকি করছেন। রাজশাহীর বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিভাগে বিএনপি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে চায়। দেশজুড়ে ঘোষিত বিভাগীয় গণসমাবেশের শেষ দিকে এসে সরকারের প্রতিবন্ধকতা বাড়তে পারে। তাই আঞ্চলিকভাবে শক্তি ও সামর্থ্য বিবেচনায় ঢাকার মহাসমাবেশের আগের সমাবেশটি রাজশাহীতে করার কৌশল নিয়েছেন তারা। রাজশাহী অঞ্চলে বিএনপি অনেক বেশি শক্তিশালী। জনসমর্থন ও কর্মী সবকিছু মিলে বিএনপির অন্য কোনো দলের প্রয়োজন নেই।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাবেশের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, যেহেতু রাজশাহীতে গণসমাবেশ শেষের দিকে তাই সরকার সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা আরও বাড়তে থাকবে। ঢাকার সমাবেশের আগে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে পারে। শক্তি-সামর্থের বিচারে রাজশাহীতে আমাদের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী। এসব বিবেচনা করে রাজশাহীতে শেষের দিকে গণসমাবেশ আযয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বেশি জনসমাগম হবে রাজশাহীতে।
এদিকে সমাবেশ ঘিরেই ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজশাহী অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। হঠাৎ করে বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণসহ সমাবেশ-পাল্টা সমাবেশকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এরইমধ্যে দায়ের হয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা।
বিএনপির নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, গণসমাবেশকে টার্গেট করে প্রশাসন দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা সাজানো হচ্ছে। সেসব ঘটনায় মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দাবি করেছেন, গণসমাবেশকে সামনে রেখে বিএনপির নেতাকর্মীরা নানা অপতৎপরতায় মাঠে নেমেছে। তাদের পাল্টা জবাব দিতে আওয়ামী লীগও প্রস্তুত আছে।
বিভাগীয় সমাবেশের সমন্বয়কারী ও বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহীন শওকত খালেক বলেন, রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলাতে প্রশাসন আক্রমাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটি খুবই অনাকাঙ্খিত। শান্তি বিঘিœনত হয় এমন কোনো কর্মসূচি বিএনপি পালন করছে না। সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করে আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করছে। তারা গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে পারছে না।
রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ বলেন, পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের অন্যায়ভাবে ধরপাকড় শুরু করেছে। গভীর রাতে তারা নিজেরাই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করছে। মূলত তারা চেষ্টা করছে সমাবেশে যেন জনসমাগম কম হয়।
ঢাকার আগে এই বিভাগীয় গণসমাবেশ প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু বলেন, রাজশাহী এখনও বিএনপির দুর্জয় দুর্গ। আমরা বহু ঘাতপ্রতিঘাত মোকাবিলা করেছি। এখন আমাদের আর কোনো ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে যাচ্ছি। আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। জনতার উত্তাল আওয়াজে যখন পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে তখন সবকিছু একই নদীর ¯্রােতে ভেসে যায়, সাগরে মিশে যায়। রাজশাহীর গণসমাবেশে তারই সূত্রপাত হবে। যতই বাধা আসুক কম করে হলেও ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে। এমন জন¯্রােত তৈরি হবে যে পুরো রাজশাহী শহরই তা ছড়িয়ে পড়বে। অনেক ঘটনার সূতিকাগার এই রাজশাহী থেকেই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে।