বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জির তিনদিনের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের প্রায় সব জেলা। সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে এই বন্যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সিলেটের সবকয়টি উপজেলার গ্রামের প্রতিটি ঘরে এখন হাঁটু থেকে কোমর পানি। এমন অবস্থায় বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী নামানো হচ্ছে। শুক্রবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসক মোঃ মজিবর রহমান জানান, সিলেটের সদর উপজেলার কিছু অংশ, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বন্যায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করবে সেনাবাহিনী। এদিকে সিলেটের জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, লামাকাজী, বিশ্বনাথ এবং ওসমানীনগরসহ সবকটি এলাকায় পানিতে টইটুম্বুর করছে। অনেক জায়গায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার বেশ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেইসাথে সুরমা, কুশিয়ারা, সারি, পিয়াইন নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়াতে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয়রা বলছে, কিছুদিন আগের বন্যা ২০০৪ সালের সালের বন্যাকে অতিক্রম করেছে। আর এবারের বন্যা ১৯৮৮ সালের বন্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। পূর্ব থেকেই প্লাবিত হওয়া এলাকায় পানি আরো বাড়ছে। বন্যায় পুরো সিলেটের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত মাসের বন্যায় দক্ষিণ সুরমা, উপশহরসহ কয়েকটি এলাকার বিদ্যুতের সাব স্টেশন পানিতে তলিতে যাওয়ায় বন্ধ করা হয়েছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু এবারের বন্যায় পুরো সিলেটের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কুমারগাঁও ১৩২-৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুমারগাঁও ১৩২-৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের এক্সেন প্রকৌশলী সুরঞ্জিত সিং বলেন, ইতোমধ্যেই উপকেন্দ্রের সুইচ ইয়ার্ডে পানি প্রবেশ করেছে। যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে এটা চলমান থাকলে কন্ট্রোল রুমে পানি প্রবেশ করতে বেশি সময় লাগবে না। যদি কন্ট্রোল রুমে পানি প্রবেশ করে তাহলে এই গ্রিড উপকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে। এতে করে পুরো সিলেট বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়বে। গত তিন দিনে আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ২৭ বছরের মধ্যে তিন দিনে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট ঢল ভাটিতে থাকা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের প্রায় সব জেলায় প্রবেশ করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আর্দ্র স্থানগুলোর একটি চেরাপুঞ্জি। স্থানীয় আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে চলতি জুনে শুক্রবার পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৪ হাজার ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে, গত মঙ্গলবার চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৬৭ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার, পরদিন বুধবার ৮১ দশমিক ১ সেন্টিমিটার এবং গত বৃহস্পতিবার রেকর্ড করা হয়েছে ৬২ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিগত ১২২ বছরের মধ্যে ৩য় সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে ১৬ জুন ১৫৬ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল চেরাপুঞ্জিতে। এদিকে, চেরাপুঞ্জির ভাটিতে থাকা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের প্রায় কয়েকটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার, সিলেটে ৭০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জে ১২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল। আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয় ও হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। সে কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে পূর্বাভাসে।