বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় সাতজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নওগাঁগামী ‘শাহ ফতেহ আলী পরিবহন’-এর একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস সকালে এরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এ সময় বাসটি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজন মারা যান।
ভোর থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। বগুড়া সদরের এরুলিয়া হাইস্কুল সংলগ্ন মহাসড়কের পার্শ্বে খোলা জায়গায় এবং দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য মানুষ। কেউ অপেক্ষা করছিলেন কাজের সন্ধানে, আবার কেউ এসেছিলেন দিনের কাজের জন্য শ্রমিক নিতে। প্রতিদিনের মতোই শুরু হতে যাচ্ছিল আরেকটি কর্মদিবস। কিন্তু মুর্হুতের মধ্যে সেই অপেক্ষার জায়গাটিই পরিণত হলো মৃত্যুর মিছিলে। যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চাপা দেয়। এতে সাতজন নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও ১৭ জন। আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদিকে স্থানীয়রা মহাসড়কে গতিনিয়ন্ত্রক স্থাপনের দাবীতে দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়ক অবরোধ করেন। সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা সেখানে দুইটি গতি নিয়ন্ত্রক স্থাপনের কাজ শুরু করলে অবরোধ তুলে নেয়া হয়। এরপর থেকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, শ্রমিক দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার দুঘোলগাছি গ্রামের তাজিমুল(৪৭), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এনায়েতপুর গ্রামের আবু সাঈদ(৪৫),জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের আনারুল হক (৫৫), জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আমিরপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম (৪০),গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বহিলগ্রামের নুর আলম(৪৫)। এছাড়াও শ্রমিক নিতে আসা বগুড়া সদরের ফাঁপোড় মধ্যপাড়া গ্রামের বেল্লাল হোসেন (৪০) ও কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়া গ্রামের নুর মোহাম্মদ (৭৫)। প্রত্যক্ষদর্শী হারুন অর রশিদ ও জোবায়ের আহম্মেদ জানান, শাহ ফতেহআলী পরিবহনের একটি এসি বাস ঢাকা থেকে নওগাঁ যাচ্ছিল। ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে এরুলিয়া হাইস্কুলের কাছে মহাসড়কের পাশের গলি পথ থেকে একটি মোটরসাইকেল হঠাৎ মহাসড়কে উঠে এলে সেটিকে বাঁচাতে গিয়ে দ্রুত গতির বাসচালক নিয়ন্ত্রণ হারান। চালক মটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে মহাসড়কের ডান পার্শ্বে বাসটিকে নিয়ে গেলে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে ধাক্কা লেগে ৫০ গজ সামনে গিয়ে বৃষ্টির কারনে মহাসড়ক পিচ্ছিল থাকায় বাসটি ঘুরে বগুড়া অভিমুখি হয়ে পড়ে এবং মহাসড়কের পার্শে অপেক্ষামান লোকজনকে চাপা দেয়। দুর্ঘটনার পরপরই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তনাদ। স্থানীয় লোকজন এসে কেউ রক্তাক্ত মানুষকে হাসপাতালে পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করেন। বগুড়া সদর থানার ওসি জানান ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনজন এবং হাসাপাতলে নিয়ে যাওয়ার পর আরো চারজনকে মৃত ঘোষনা করেন।দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোজ খবর নেন। আহতদের চিকিৎসায় সংকট দেখা দেয় বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের।জেলা প্রশাসক রক্ত সংগ্রহ করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যটাস দিয়ে রক্তদাতা হাসাপাতালে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন। এছাড়াও তিনি নিহতদের লাশ পরিবহন এবং দাফন কাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা জন প্রতি প্রদানের ঘোষনা দেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক তিন সদস্যের একটি কমিটি করার ঘোষনা দেন। এদিকে দুপুর ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মনোয়ারুল কাদের বিটু শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন এবং তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে তিনি জানান। দুর্ঘটনায় শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কয়েকজন যাত্রী আহত হলেও তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের যাত্রী নওগাঁ সদরের ইউনুছ আলী বলেন,ভোর বেলা মহাসড়কে যানবাহন একেবারেই কমছিল। বাসটি বগুড়া চারমাথা বাস টার্মিনাল অতিক্রম করার পরপরই দ্রুতগতিতে চালাচ্ছিলেন চালক।এরুলিয়া এলাকায় বৃষ্টিতে ভেজা মহাসড়কে বাসটিকে নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে ঘুরে বগুড়া অভিমুখি হয়ে পড়ে। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, এরুলিয়া এলাকায় তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি মসজিদ ও অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সড়ক বিভাগ এই এলাকাটিকে দুর্ঘটনা প্রবন উল্লেখ করে সাইনবোর্ড দিয়ে রেখেছে। কিন্তু এখানে মহাসড়কে কোন গতি নিয়ন্ত্রক নেই। প্রতিদিন ভোরে বিপুলসংখ্যক দিনমজুর জড়ো হলেও সেখানে নিরাপদ অপেক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। মহাসড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাঁদের। একারনে মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। মহাসড়কে দুইটি গতি নিয়ন্ত্রক স্থাপনের দাবীতে দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন লাঠি শোটা নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াজেদ আলীসহ পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। জনগনের দাবী মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রকের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা অবরোধ প্রত্যাহার করবেন না।সকালে সাড়ে ১০ টার দিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এরুলিয়া হাইস্কুল এলাকায় মহাসড়কের উভয় পার্শ্বে দুইটি গতি নিয়ন্ত্রক স্থাপনের কাজ শুরু করলে জনগন অবরোধ তুলে নেন।এরপর মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা( ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন দুর্ঘটনার পরপরই বাসের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার পালিয়ে যায়। বাসটি জব্দ করা হয়েছে। বাসের চালক হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। নিহত সাতজনের লাশ পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ময়না তদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে।
