শাহীন রহমান, পাবনা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবশেষে বহুল আলোচিত পাবনা-৩ আসনে ঘোড়ার চালে মাত হয়ে গেছে ধানের শীষ। আর তাতে বিজয়ের ফসল উঠেছে দাঁড়িপাল্লায়। পাবনা-৩ আসনের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আলী আছগার। ফলাফল ঘোষণার পর থেকে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের পরাজয়ের নেপথ্যে কি কারণ? তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলামের ঘোড়া কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেসে টিকতে পারলেন না? অথচ নির্বাচন শুরুর পর থেকে সবারই ধারণা ছিল লড়াই হবে ধানের শীষের সাথে ঘোড়ার। তৃতীয় অবস্থানে থাকবে দাঁড়িপাল্লা। অথচ দাঁড়িপাল্লা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গোল দিয়ে দিলো ধানের শীষ আর ঘোড়াকে। ত্রিমুখী লড়াই হয়ে গেলো দ্বিমুখী। কেন এগিয়ে গেলো দাঁড়িপাল্লা আর কেনই বা পিছিয়ে পড়লো ধানের শীষ আর ঘোড়া, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা আর সমালোচনা। আলোচনায় যাবার আগে চলুন একনজরে চোখ বুলিয়ে নেই পাবনা-৩ আসনের ভোটের ফলাফলে। চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে পাবনা-৩ আসন। এই আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৪। মোট ভোট কেন্দ্র ১৭৭টি। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ভোটার ১ লাখ ৭ হাজার ৭১১ জন এবং ফরিদপুর উপজেলায় ভোটার ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯১ জন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৮ জন প্রার্থী। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলী আছগার ১ লাখ ৪৭ গাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৭ ভোট। আর বাকি ৫ জন প্রার্থী সবাই মিলে পেয়েছেন ৫ হাজার ৪২০ ভোট। অর্থাৎ ৩ হাজার ২৬৯ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। আর ঘোড়া প্রতীকের সাথে তাঁর ব্যবধান ১ লাখ ৯ হাজার ৪৪৮ ভোট। অপরদিকে দুই পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ধানের ঘোড়ার চেয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৯ ভোট বেশি পেয়েছে ধানের শীষ। এই আসনে মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৮১১। বাতিল ভোটের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৮৩। ভোট সংগ্রহের হার শতকরা ৭০.২২ ভাগ। বাতিল ভোটের অর্ধেকও যদি ধানের শীষ পেতো তাহলে ফসল উঠতো তাদের ঘরে। আরেকটি হিসাব করে দেখা যাক। উপজেলাওয়ারী প্রাপ্ত ভোট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাটমোহরে ধানের শীষ পেয়েছে ৭৭ হাজার ১০০ ভোট, দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৬২ হাজার ৭২০ ভোট, আর স্থানীয় প্রার্থীর ঘোড়া পেয়েছে ৩১ হাজার ৬৪৭ ভোট। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৪৪ হাজার ২১২ ভোট, ধানের শীষ পেয়েছে ২৮ হাজার ৬০৩ এবং ঘোড়া পেয়েছে ৪ হাজার ৫৯৫ ভোট। ফরিদপুর উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা ৩৮ হাজার ৯০৫, ধানের শীষ ৩৭ হাজার ৮৩৭ এবং ঘোড়া ১৬১০ ভোট। এখানে ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাটমোহরে দাঁড়িপাল্লার চেয়ে ধানের শীষ ১৩ হাজার ৩৮০ ভোট বেশি পায়। ভাঙ্গুড়ায় আবার ধানের শীষে চেয়ে ১৫ হাজার ৬০৯ ভোট বেশি পায় দাঁড়িপাল্লা। অন্যদিকে ফরিদপুর উপজেলায় ধানের শীষের চেয়ে ১০৬৮ ভোট বেশি পায় দাঁড়িপাল্লা।ভাঙ্গুড়ার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ভাঙ্গুড়ার সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ায় এবং একইসাথে ফরিদপুর উপজেলায় ধানের শীষ জেতার কথা সেখানেও দাঁড়িপাল্লারে ভোট বেশি পাওয়ায় বিজয়ী হয়েছেন। আর চাটমোহরে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও ধানের শীষের প্রার্থী অন্য দুই উপজেলায় হেরে যাওয়ায় পরাজিত হয়েছেন। আর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেসে টিকতেই পারেনি ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার। অথচ শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে বিজয়ীর হওয়ার আভাস মিলেছিল সর্বমহলে। আর যাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয় হওয়ার ধারণা করেছিলেন সবাই, সেই দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আছগার হয়ে গেলেন প্রথম। ঘোড়া প্রতিকের প্রার্থী আনোয়ারের বাড়ি চাটমোহরে হওয়ার সুবাদে তিনি অন্তত চাটমোহর থেকে ৮০ হাজার ভোট পাবেন বলে ধারণা করেছিলেন সবাই। ফরিদপুরে হারলেও ভাঙ্গুড়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লার সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করার কথা ছিল ঘোড়ার। কিন্তু তার কিছুই করতে পারেননি তিনি। এখন বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থী হেরে যাবার কারণ কি চলুন সেটা একটু জানা যাক। প্রার্থী ও নেতাকর্মী সমর্থকদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানা গেছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয়ের প্রধান কারণ বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম। বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে অনায়াসে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হতেন। দ্বিতীয় কারণ, তার দলের কিছু নেতা নির্বাচনের খরচের টাকা নিয়ে ঠিকমতো কাজ করেননি। অর্থাৎ কিছু নেতা বেঈমানী করেছেন। তৃতীয় কারণ, প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি ও তারেক রহমানের বন্ধু হওয়ায় তার আত্মঅহংকার। চতুর্থ কারণ, দলীয় গ্রুপিং এর কারণে নেতাকর্মীরা ছিলেন বিভক্ত। আর বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম পরাজিত হওয়ার কারণ হলো এক. তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। দুই. জনপ্রিয়তা থাকলেও, টাকার অভাবে তিনি মাঠ ও নেতাকর্মী ধরে রাখতে পারনেনি। তিন. বিএনপির বড় অংশের ভোট ধানের শীষের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে চলে যাওয়ায় পিছিয়ে ছিলেন তিনি। চার. স্থানীয় প্রার্থীকে এমপি চাই এমন হাইপ তুলে শেষ পর্যন্ত সেটি ধরে রাখতে পারেননি। সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলনটি নিয়ে যেতে পারেননি। পাঁচ. প্রতিপক্ষের প্রার্থীর কর্মীরা তার বিরুদ্ধে অনলাইনে লাগাতার বিভিন্ন অপপ্রচার ও নেতাকর্মীদের হুমকি ধামকি, মারধর। সবচেয়ে বড় কথা নিজ উপজেলা চাটমোহরে তিনি যে পরিমাণ ভোট পাওয়ার কথা তার অর্ধেক ভোটও পাননি। আর দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আলী আছগারের বিজয়ের পেছনে প্রধান কারণ, বিএনপির এই গ্রুপিং তার বিজয়ের পথকে সহজ করে দিয়েছে। অর্থাৎ ঘোড়ার সামান্য চালে মাত হয়ে গেছে ধানের শীষ। আর তাতেই কপাল খুলেছে দাঁড়িপাল্লার। দ্বিতীয় কারণ, নারী ভোটারের একটি বড় অংশের ভোট পড়েছে দাঁড়িপাল্লায়। তৃতীয়. নিজ উপজেলা ভাঙ্গুড়ার মানুষ তাকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। যে ভোট ব্যবধান গড়ে দিয়েছে জয়ের ক্ষেত্রে। ভাঙ্গুড়ায় যে পরিমাণ বেশি ভোট দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে সেই ভোট অন্য দুই উপজেলা মিলিয়েও কাভার করতে পারেননি ধানের শীষের প্রার্থী। ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চাটমোহর উপজেলার সদস্য সচিব চাটমোহর পৌর বিএনপির সভাপতি আসাদুজ্জামান আরশেদ বলেন, ফরিদপুর উপজেলায় বিএনপি সবসময় জিতে এসেছে। এবারও জিতবো সেই আশা ছিল। কিন্তু সেখানে কিভাবে জামায়াত জিতলো সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। আর বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে ভোটের ফলাফলে একটু প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট চাটমোহর উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সাবেক সদস্য সচিব হাসাদুল ইসলাম হীরা বলেন, আমাদের ঘোড়া প্রতিকের পরাজয়ের প্রধান কারণ, ধানের শীষের লোকজন লাগাতারভাবে অপপ্রচার চালিয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। শেষের তিনদিনে তা মাত্রাছাড়া অপপ্রচার চালিয়েছে তারা। সাধারণ মানুষও সেটি বিশ্বাস করেছে। আর একটি কারণ হলো আওয়ামী লীগের ভোটের একটি বড় অংশ দাঁড়িপাল্লায় দিয়েছে। নিজের পরাজয়ের পেছনে কারণ হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটের প্রভাব মানতে নারাজ বিএনপির প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন। তিনি বলেন, যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন, তিনি তার মতো করে ভোট করেছেন। তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক ছিল না। আর ভোট কারচুপি করেছে জামায়াত ও ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা তাদের লোকজন। এ জন্য আমি ফলাফল পুনর্গণনার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি। বিদ্রোহী প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আশা করেছিলাম চাটমোহরবাসীর ভোটেই আমি জয়ের পথে অনেকদূর এগিয়ে থাকবো। তাছাড়া শুরু থেকেই আমাদের বিভিন্নভাবে বাধা দিয়েছে প্রতিপক্ষের লোাজজন, অপপ্রচার চালিয়েছে। আশানুরুপ ভোট পাইনি। যে কারণে জিততে পারিনি। তবে সবার প্রতি ভালোবাসা আর শুভ কামনা রইল।বিজয়ী জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আলী আছগার বলেন, ধানের শীষ আর ঘোড়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে আমি বেরিয়ে গেছি এটা কিছুটা ঠিক। তবে যতুটুকু বুঝেছি মানুষ পরিবর্তন চায়। নতুন কাউকে চায়। সেক্ষেত্রে আমি এগিয়ে গেছি। আর সম্মান দেয়ার মালিক আল্লাহ। তিনি চেয়েছেন আর আমরা চেষ্টা করেছি।