সিলেটবাসীর কাছে ভোট চেয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত ৫৪ বছর অনেককে দেখেছেন। এবার আমাদের ভোট দিয়ে একবার দেখেন। আমাদের ভোট দিয়ে দেশ সেবার সুযোগ দিলে, আল্লাহ আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কবুল করলে ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে কোথাও কোনো বৈষম্য, বেইনসাফ করা হবে না। প্রতিটি এলাকার নায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না। আপনারা মনে কষ্ট নেবেন না। আমি এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আজ শনিবার বিকেল সোয়া ৪টায় সিলেট নগরীর ঐতিহাসিক সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে, সকালে হবিগঞ্জ ও নিজ উপজেলা কুলাউড়ায় জনসভায় ভাষণ দিয়ে তিনি দুপুরে হেলিকপ্টার যোগে সিলেট এসে পৌঁছান। এসময় ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ‘দাঁড়িপাল্লা, ইনশাআল্লাহ’, ‘সব দেখেছি বার বার দাঁড়িপাল্লা এইবার’ স্লোগানে মুখরিত ছিল সমাবেশস্থল। জামায়াত আমির বিকেল ঠিক ৩টা ৩৫ মিনিটে জনসভায় ভাষণ দিতে শুরু করেন। ২৫ মিনিটের বক্তৃতা এবং এমপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে সোয়া ৪টা পর্যন্ত মঞ্চে অবস্থান করেন তিনি। এসময় জামায়াত আমির বলেন, আমি এই সিলেটের সন্তান। কারো ভাই, কারো চাচা, কারো দাদা। আমি এখানে জামায়াত আমির হিসেবে দাঁড়াইনি। আমি আপনাদের সন্তান হিসেবে দাঁড়িয়েছি। আপনারা অনেককে সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের একবার সুযোগ দেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে আমরা এই সিলেটকে পাল্টে দেবো। সিলেটের যে যৌক্তিক দাবি-দাওয়া তা পূরণ করব। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের কোথাও বৈষম্য করা হবে না। তিনি বলেন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর নামেই আন্তর্জাতিক, কাজে নয়। জামায়াতকে দেশ সেবার সুযোগ দিলে ওসমানী বিমানবন্দর পূর্নাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হবে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানের ফ্লাইট উঠানামা করবে। বাংলাদেশ বিমানের ম্যানচেস্টার রুট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা বন্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। আমরা ক্ষমতায় গেলে নতুন রুট চালু করা হবে। সিলেটকে বাংলাদেশের সবচেয়ে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চল উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কিন্তু দু:খের বিষয়, সিলেটবাসী গ্যাস পায় না। সিলেটের নদীগুলো মরা বানানো হয়েছে। মদ গাঁজা সিলেটকে অস্থির করে রাখে। আমরা এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। আমরা ক্ষমতায় গেলে সিলেটের যে নায্য হিস্যা রয়েছে, সেটা বুঝিয়ে দেবো। জামায়াত আমির বলেন, সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। এই দেশের প্রবাসী যারা মধ্যপ্রাচ্যে যায়, অনেকে সেখানে ইন্তেকাল করেন, তাদের লাশ সম্মানের সাথে দেশে নিয়ে আসা হবে। যারা বিদেশে গিয়ে রুজি-রোজগারের আগেই মারা যান, তাদের পরিবারের দায়িত্ব সরকার নেবে। যারা প্রবাসীদের নিয়ে মশকারা করেছে, তাদের ধিক্কার। এবার প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে আমরা ক্ষমতায় গেলে আগামীতে সব প্রবাসীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করব। তিনি বলেন, দূষণে ভুগছে দেশের নদীগুলো। আমরা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের নদীগুলোর জীবন দেয়া হবে। সুরমা-কুশিয়ারা শুধু বইয়ে নদী নয়, বাস্তবে জীবন্ত হবে। বাংলাদেশের মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। একেক এলাকাকে কৃষি শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জেলের হাতে জাল থাকবে। হাওরের মাছের ঘের জেলেরাই পাবে। চা শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। জামায়াত আমির বলেন, রাজার ছেলে রাজা, রাণীর ছেলে রানী হবে, আমরা সেই ধারা পাল্টে দিতে চাই। চা শ্রমিকের ছেলে-মেয়েও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে। ‘সিলেটে একটা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, এতিমের মতো পড়ে আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রুগ্ন। আমরা ক্ষমতায় গেলে এসব কলেজকে রুগ্ন অবস্থা থেকে প্রাণ দেয়া হবে। বাংলাদেশের সবজায়গায় সুষম উন্নয়ন হবে। তবে সিলেট আর বঞ্চিত হবে না।’ ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর একজন জালিমের বিরুদ্ধেও জামায়াত প্রতিশোধ নেয়নি মন্তব্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা বলেছিলাম, যারা আমাদের ওপর জুলুম করেছে, আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন অনেকে সমালোচনা করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নেতাকর্মীরা কথা রেখেছে। আমাদের দলের কেউ জুলুম করে নাই, মামলা বাণিজ্য করে নাই। তিনি বলেন, একজন জালিমের বিরুদ্ধেও দল হিসেবে জামায়াত প্রতিশোধ নেয়নি। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের বলেছি, কেউ ক্ষুদ্ধ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আদালতে যেতে পারেন। তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি তখন বলেছিলাম, আমরা যারা মজলুম ছিলাম, আমরা যেন জালিম না হই। একজন সেন্সিবল নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব থেকেই সেটা বলেছি। কিন্তু একটি পক্ষ কথা রাখে নাই। এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমাদের কর্মীরা আমাদের কথা রেখেছে। তারা কোনো জুলুম ও মামলা বাণিজ্য করেনি। যারা ৫ আগস্টের পর নতুন করে জুলুম করেছে, বিবেকের আদালতে তাদের বিচার করবে জনগণ। তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে কেউ ঘুষ দেয়া এবং নেয়ার সাহস পাবে না। সকল নাগরিক সম্মানের সাথে বসবাস করবে। বিগত ৫৪ বছর বিদেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না টাকা পাচার করেনি। সবাই কম বেশি পাচারে জড়িত। এটা জনগণের হক। এই হক যদি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়, তাহলে অভিনন্দন জানানো হবে। আর যদি না দেয়, তাহলে রাষ্ট্র পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনবে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হলে দেশের উন্নয়ন হবে। পাঁচ বছরে বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে। তিনি বলেন, একদল আছে মা-বোনদের সম্মান দিতে জানে না। আমি সম্মানের কথা বললে তারা মিসাইল ছোঁড়ে। চোর ধরা পড়েছে, তবুও তারা চোরের পক্ষে সাফাই গায়। চোরের মায়ের বড় গলা।