পাবনা প্রতিনিধি: সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিকতায় বাঙালি বিয়ে ব্যাপক বর্ণিল ও বিচিত্র। যা আকর্ষণ করে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকেও। এবার এ বর্ণিল আয়োজন আকর্ষিত করেছে আমেরিকান তরুণী ভিক্টোরিয়াকে। ভ্রমণ ও বিচিত্র সংস্কৃতি উপভোগের নেশা থেকে এবার বাঙালি বান্ধবীর ভাগই য়ের বর্ণিল বিয়ে আয়োজন উপভোগ করতে ছুটে গিয়েছিলেন পাবনায়। এ সংস্কৃতিকে গভীরভাবে অনুভব করতে সেজেছেন একদম বাঙালি সাজে। পরনে শাড়ি ও ব্লাউজের সাথে সাজসজ্জায় হয়ে উঠেছেন বাঙালি। নেচে-গেয়ে একদম যেনো বিয়ে বাড়ির বাঙালি মেয়ে। আবার খাচ্ছেন সাধারণ বাঙালি খাবার। সস্প্রতি আমেরিকান তরুণী ভিক্টোরিয়ার এ রুপ দেখা গেছে পাবনা শহরের বাসিন্দা ও আমেরিকা প্রবাসী চাকুরীজীবী তানভীর ইসলাম ও মেহেজাবীন মতিন মৌ এর বিয়ের তিন দিনব্যাপী বিয়ের অনুষ্ঠানে। তানভীর ইসলাম পাবনা পৌর সদরের শিবরামপুর মহল্লার রফিকুল ইসলামের ছেলে। আমেরিকা প্রবাসী চাকুরীজীবী। পাবনার জনপ্রিয় ব্যান্ড দল বিহঙ্গ এর লিড গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট। সংগীত পরিচালক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। আর ভিক্টোরিয়ার পুরো নাম ভিক্টোরিয়া ডেগতারেভা (৩৫)। তিনি জন্মসূত্রে রাশিয়ান। আমেরিকায় বিউটিশিয়ানের পেশায় নিয়োজিত। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ ও কালচার উপভোগ তার প্রধান শখ। আয়োজকরা জানান, ভিক্টোরিয়াতর বাবা ও মা রাশিয়াতেই থাকেন। কাজের জন্য ১২ বছর ধরে তিনি থাকেন আমেরিকায়। বেড়াতে তাঁর ভালো লাগে। বিভিন্ন দেশের খাবার ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করে। তাই সুযোগ পেলেই অন্য দেশে বেড়াতে যান। তাঁর সহকর্মী বান্ধবী তনিমা ইসলাম আঁখির ভাই তানভীরের বিয়ে হচ্ছে জেনে তনিমার আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ৭ এপ্রিল ভিক্টোরিয়া তনিমার সাথে বাংলাদেশে ও পাবনায় আসেন। এরপর বিয়ের কেনাকাটা থেকে শুরু করে এনগেজমেন্ট, মেহেদী উৎসব সহ সব আয়োজনে মিশে ছিলেন পরিবারের সদস্যের মতো। গত বুধবার (৯ এপ্রিল) কন্যার গায়ে হলুদ, বৃহস্পতিবার বরের গায়ে হলুদ, শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠান ও শনিবার বৌভাত অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভিক্টোরিয়া। আয়োজকরা জানান, দেখতে ভিক্টোরিয়া আলাদা হলেও অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে কনের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে তিনি নীল রঙের শাড়ি পরেছিলেন। শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠানে বরযাত্রীতে হলুদ শাড়ি পরে বরণডালা হাতে অনুষ্ঠানে গেছেন। বৌভাতের দিনেও তিনি শাড়ি পরেছেন। বাঙালি খাবার খেয়েছেন বাঙালি ঢংয়ে। চামচ দিলেও সেটি ব্যবহার করেননি। ঘুমিয়েছেন সবার সাথে বিয়ের বাড়ির খোলামেলা পরিবেশে। শিশু বাচ্চা দেখলেই কোলে তুলে নিয়েছেন আপন মমতায়। দীর্ঘ সময় কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভিক্টোরিয়া সবার সঙ্গে একদম মিশে ছিলেন বলেও জানান আয়োজকরা। বর তানভীরের বড় বোন ও ভিক্টোরিয়ার আমেরিকাস্থ সহকর্মী তনিমা ইসলাম আঁখি বলেন, হুট করে ভিক্টোরিয়া আসায় আমরা একটু চিন্তায় পড়েছিলাম। কারণ আমেরিকার পরিবেশ ও কালচার তো এক নয়। এখানে তাও আবার মফস্বল শহুরে কালচার। তবে এসব চিন্তা বেশিক্ষণ থাকলো না। দেখলাম মুহুর্তেই সবার সঙ্গে ভিক্টোরিয়া মিশে গেছে। বাড়িতে যা রান্না হচ্ছে, তা–ই খাচ্ছে। চামচের দরকার হচ্ছে না, দিলেও চামচ ব্যবহার করছে না। বাঙালি খাবারের মধ্যে খিচুরী সে বিশেষভাবে উপভোগ করেছে বলে জানিয়েছে। সে যে আমেরিকা থেকে এসেছে, তা বোঝার উপায় নেই। বাড়ির একজন হয়ে-ই রয়েছে। বিয়ের আয়োজনে সবার কাছে বাংলা নববর্ষের বর্ণিল রূপ সম্পর্কে জেনেছেন ভিক্টোরিয়া। এখন মুখিয়ে আছেন সেসব আয়োজনে অংশ নিতে। বর তানভির ইসলাম বলেন, আমার বাবা-মা-ও আমেরিকায় থাকেন। অসুস্থ্যতার জন্য তাঁরা আসতে পারেননি। এজন্য মন কিছুটা খারাপ ছিলো, মনে হচ্ছিলো বিয়ের আয়োজনটা তেমন জমবে না। কিন্তু সেই জায়গাটুকু উনি (ভিক্টোরিয়া) অনেকটা ফিলাপ করেছে। তার দ্রুত সবার সাথে মিশে যাওয়া ও হইহুল্লোড় বিয়ের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এভাবে সবার সঙ্গে মিশতে পারবেন এটা ভাবতে অবাক লেগেছে। উনার উপস্থিতি বিয়ের অনুষ্ঠানকে নতুনভাবে রাঙিয়েছে। রিসোর্টে বৌভাত অনুষ্ঠানেও তিনি শাড়ি পরে সবার সাথে হইহুলোড়ে দিন কাটিয়েছে। অন্যরাও তার সঙ্গ ব্যাপকভাবে উপভোগ করেছেন। সবাই তার সঙ্গে ছবি তুলেছে। সেও সবার সঙ্গে ছবি তুলেছে। সবার সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতেছিলো।

তানভীরের বন্ধু নুজহাত তুষ্টি বলেন, উনাকে আমরা আলাদা করেতে পারিনি। কেননা সবার সাথে একদম মিশেছিলেন। আমার সাত মাস বয়সী ছেলে রাজ্যকে উনি দেখেই কোলে তুলে নিলেন। এরপর টানা দুই ঘন্টা কোলে নিয়ে ঘুরেছেন। নামাতে চান না। চাইলেও দেন না। একদম বুকের সাথে জাপ্টে রাখলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ছেলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে, ওই অবস্থাতেও কোল থেকে নামালেন না। প ভাবরদিন আমাকে দেখে আবার জিজ্ঞেস করছেন- রাজ্য কোথায়। এসব ব্যাপার আমাদের অবাক করেছে। দুজন মানুষের একসঙ্গে হওয়ার জন্য এত আয়োজন তাকে মুগ্ধ করেছে জানিয়ে ভিক্টোরিয়া বলেন, রাশিয়াতেও বিয়ে বাড়িতে গেট ধরে বরের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ঐতিহ্য আছে। তবে বাংলাদেশেরটা তার কাছে বেশি উপভোগ্য মনে হয়েছে। বর ও কনের গায়েহলুদ থেকে শুরু করে পুরো আনুষ্ঠানিকতাটাই বেশ রঙিন ছিল। এটা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। আমেরিকায় বাঙালি খাবার পাওয়া সম্ভব হলেও কখনো খাওয়া হয়নি, এখানে এসে খেয়ে মনে হয়েছে তিনি এ খাবারগুলো না খেয়ে মিস করেছেন। তিনি বলেন, মিসর, গ্রিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেলেও বাঙালি বা ইন্ডিয়ান কালচার সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। তাই বাংলাদেশে আসার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। এখানে এসে এবং বিয়ের এমন দীর্ঘ ও বর্ণিল আয়োজন দেখে তিনি অসম্ভব আনন্দিত বলে জানান। একইসাথে সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার যে কালচার বাংলাদেশে তিনি দেখলেন এটি তাকে মুগ্ধ করেছে বলেও জানান।