ডেস্ক রিপোর্ট : পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বিভিন্ন জনকে তুলে নেয়ার এবং তাদের অনেকের খোঁজ না মেলার কথা প্রায়ই শোনা যেত। দেশি-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন মহল এবং ভিকটিমদের পরিবার পরিজনদের অভিযোগ ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা এখন প্রমাণিত। পুলিশ লাইনে গোপন বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। গত ৫ মার্চ গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের গুলশানস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সদস্য নূর খান বগুড়া পুলিশ লাইনে কারাগারের মতো গোপন বন্দিশালা পাওয়ার তথ্য দিয়ে বলেছেন, এটা এবসার্ট ব্যাপার। আমাদের (গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন) ধারণা অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের বন্দিশালা আরও পাওয়া যাবে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার নাগরিক নির্যাতনে কতটা হিংস্র ছিল তার নমুনা এখন একে একে বেরিয়ে আসছে। পুলিশ লাইনে গোপন কারগার তৈরি সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জোট সরকার তার সেবাদাস পুলিশ সদস্যদের দিয়ে পুলিশ লাইনে গোপন কারাগার তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশের সর্বত্র গুমাতংক বিরাজমান ছিল। ওই সময় ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আমি গুম হব না এমন নিশ্চয়তা দিতে পারি না। পতিত সরকারের সময় সংঘটিত প্রতিটি গুমের ঘটনার ব্যাপক তদন্তের দাবি রাখে। এসব ঘটনার সাথে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা ন্যায় বিচার এবং আইনের স্বার্থে জরুরি। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ইতিমধ্যেই বিগত সরকারের সময় গড়ে তোলা গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরসহ বিভিন্ন স্থানে গোপন কারাগার তৈরি করে মানুষকে বন্দি করে রাখার, নির্যাতনের সত্যতা পেয়েছে। বিভিন্ন মহলের সন্দেহ গুম হওয়াদের অনেকেই ভারতের কারাগারে আটক রয়েছেন। আওয়ামী জোটের শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া কয়েকজনকে ভারতে পাচার ও পাচারের চেষ্টা হয়েছে। ওই সময় কবি ফরহাদ মাজাহারকে ভারতে পাচারের চেষ্টা, ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ ও মাওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর ভারতে পাচারের তথ্য সবার জানা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ ভারতের কারাগারে থাকার সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যায় না।
গুম কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কমিশনের কাছে জোরপূর্বক গুমের শিকার এমন ৩৩০ জনের তালিকা আছে, যারা এখনো ফিরে আসেননি। ওই ব্যক্তিদের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কমিশনের প্রতি আমাদের আহ্বান, ৩৩০ জনের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও তাদের সন্ধানের তৎপরতা বন্ধ করা ঠিক হবে না বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। ৩৩০ জনকে গুমের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানা যাবে। ভারতের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশী নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন যারা তাদের পরিবার-পরিজন পথ চেয়ে বসে আছে হয়ত একদিন আপনজন ফিরে আসবে। আওয়ামী জোটের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুমের প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখা এবং জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (বলপূর্বক অন্তর্ধান, যাকে গুম বলি আমরা) মানুষের মৌলিক অধিকারের সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘনগুলোর মধ্যে একটি বিবেচিত হয়। গুমকে আন্তর্জাতিকভাবে মানব মর্যাদার বিরুদ্ধে অপরাধ গণ্য করা হয়। গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত ও দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তদন্তে আওয়ামী জোট সরকারের সময় সংঘটিত গুমের লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসছে, সামনে আরো বেরিয়ে আসবে ধরে নেয়া যায়। গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির তদন্তে পুলিশ লাইনে গোপন কারাগারের সন্ধান পাওয়ায় আমাদের মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে গোপন কবরের সন্ধানও মিলতে পারে। পুলিশ লাইনে গোপন কারগারের সন্ধান গুপ্তহত্যা, গুপ্তকবরের সন্দেহ ঘনীভূত করে। পুলিশ লাইনে গোপন বন্দিশালা আবিষ্কার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জোট সরকারের নিষ্ঠুরতার মাত্রা চাউর করেছে।