রাতুল সরকার, রাজশাহী: রাজশাহীর কাটাখালি খালটি দুই বছর আগে খনন করা হয়েছিল প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে। উদ্দেশ্য ছিল বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের ফসল চাষে সেই পানি ব্যবহার করা। সোমবার সেই খাল পরিদর্শন করে দেখা গেছে খালের কোথাও এক হাঁটু পানিও নাই। যে মাটি কেটে পাড়ে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো এই দুই বছরে আবার খালে নেমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কোথাও ছিটেফটা পানি, তো কোথাও সুকনো। আবার কথাও কচুরি পানায় ভরে গেছে। পবার হরিয়ান বিলের কৃষকদের জন্য এই খাল কোনোই কাজে আসছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকরা শ্যালো মেশিন দিয়ে ভূগভিরস্থ পানি তুলে জমিতে সেঁচ দিচ্ছেন। শুধু এই খালই নয়, প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে পবার জোহা ৩ দশমিক ১৪৭ দশমিক খালটিও মৃতপ্রায় হয়ে আছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪-২০১৮ মেয়াদের খাল খননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের ৯টি জেলায়। তিন হাজার ৫৪০ হেক্টর জমি সেঁচ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৯ সালের দিকে। এর আগে কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বিএমডিএ। তবে সরেজমিন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই প্রকল্প দুটি বছর না ঘুরতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর এখন কোনো কাজেই আসছে না। খননের আগের মতো খালগুলোতে বর্ষার পরে শীতকালে কিছুটা পানি থাকলেও চৈত্র-বৈশাখ খরা মৌসুমে একেবারে শুকিয়ে আটফাটা হয়ে যায় এই খালগুলো। বিএমডিএ’র খাল খনন প্রকল্পের এই যখন অবস্থা, তখন আবারও প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরাঞ্চলজুড়ে চলছে খাল খনন প্রকল্প। ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে পুকুর খনন প্রকল্প। এমনিতেই রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে গত ৭-৮ বছরে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার পুকুর। এসব পুকুরেই ভরে গেছে উত্তরাঞ্চল। এর মধ্যে খাস পুকুর সংস্কারের নামে ১২৮ কোটি টাকা লোপাটের আরেকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন কৃষকরা।
বিএমডিএ সূত্র মতে, খাল খননের মাধ্যমে ‘ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নাটোর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০২২-২০২৩ মেয়াদ ধরে এই প্রকল্পটির কাজ এখন চলমান। সম্প্রতি এ প্রকল্পের আওতায় ৭৫টি গ্রুপে টেন্ডার হয়েছে। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে এই ৭৫ গ্রুপের কাজের পেছনে। গত বছর থেকে শুরু হয় এই প্রকল্পটির কাজ। ১৫৫ কিলোমিটার খাল খনন এই প্রকল্পের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ৫৫ কিলোমিটার। ৭ হাজার ২৫৭ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে পানি নিষ্কাশণের মাধ্যমে কৃষি জমি উপযোগীকরণ লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৪৭ হেক্টর। এ প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৩৩ ভাগ। বর্ষার আগে যেসব খাল খনন করা হয়েছিল, সেগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। আগামী বর্ষার পরে বাকিটুকুও ভরাট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বিএমডিএ সূত্র মতে, খাল খননের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০২৪ সাল মেয়াদে ২৫০ কোটি ৫৬ রাখ টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প চলমান। খাল খননের মাধ্যমে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর কৃষি জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৫০ হেক্টর জমি। এ প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ২১ ভাগ। এখনো টেন্ডার চলছে। তবে এ প্রকল্পেরও কাজের মাণ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
এদিকে, সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পবা জোহা খালি খালের পাড়ের কৃষক আবুল কালেম বলছিলেন, ‘বিএমডিএর খাল খনন প্রকল্পগুলো ভূতুড়ে প্রকল্প। খাল খনন করার পরে মাটি ফেলা হয় পাড়েই। আবার যে পরিমাণ গভীর করার কথা বলা হয়, সেটিও করা হয় না। ফলে বছর না যেতেই ভরাট হয়ে যায় খালগুলো। এতে খরা মৌসুমে কোনোই কাজে আসে না খননকৃত খালগুলো। শুধু শুধু টাকা অপচয় হচ্ছে সরকারের।’
তিনি আরও বলেন, এই জোহা খালটি ৪-৫ বছর আগে খনন হয়েছে। এখন সামান্য পানি আছে। শীত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পানিও থাকবে না। খাল খননের আগেও বর্ষার পরে কিছুদিন পানি থাকত। তার পরে খরা মৌসুমে পানি থাকত না। এখনো তাই অবস্থা। তাহলে এই খাল খনন করে কি লাভ হলো? প্রশ্ন করেন তিনি। আবুল কাশেম আরও জানান, ‘চৈত-বৈশাখে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করতে গভীর নলকূপ থেকে পানি সেঁচ করতে হবে। তখন এই খাল কোনোই কাজেই আসে না। একটুও পানি থাকে না।’
এ ছাড়া ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীর চারঘাট থেকে পুঠিয়া পর্যন্ত বড়াল খাল (নদী) খননের জন্য ব্যয় করা হয়েছিল আট কোটি টাকা। এই খালটিওে খরা মৌসুমে পানি থাকে না বলে জানিয়েছেন বড়াল খালের পাড়ের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম।
চারঘাটের বড়াল খালটি প্রস্থে ১৫ মিটার ও গভীরতা ৫-৬ মিটার করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। ফলে কিছুদিন পরেই আবার ভরাট হয়ে যায় ওই খালটি।
এদিকে নতুন প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে নাটোরের খাল খনন প্রকল্পের পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এবারকার প্রকল্পটি খুবই গুরুত্ব দিয়ে করব। কোনো অনিয়ম হবে না। এ প্রকল্পের আওতায় খাল খনন হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন। টেন্ডারেও কোনো অনিয়মের সুযোগ নাই। ওপেন পদদ্ধিতে টেন্ডার হচ্ছে। যারা যোগ্য তারা কাজ পাবেন। কারও সঙ্গে দেন দরবারের বিষয়টি সঠিক নয়।’
বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গেই কাজ করছি। খাল খননের মাধ্যমে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। কিছু কিছু অভিযোগ থাকলেও তার কোনো সত্যতা মেলেনি। কৃষকদের উন্নয়নের স্বার্থেই বিএমডিএ বিভিন্ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে চলেছে।