মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: চলতি মৌসুমে রাজশাহী দুর্গাপুরে আমন ধানের আবাদি বিস্তীর্ণ ফসলে সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো খেলে যাচ্ছে সবুজ পাতার ফাঁকে সোনালী রঙের ধানের র্শীষগুলো। আর এমন সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলে উঠছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। সোনালী ধানে ছেয়ে গেছে মাঠ। এবছর আমন ধান চাষ সুখকর ছিল না। অনাবৃষ্টি ও জ্বালানি তেলের সংকটে সঠিক সময়ে অনেকেই ধান চাষ করতে পারেনি। তবে নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কোথাও সোনালী ধানের শীষে ঝলমল করছে মাঠের পর মাঠ। রাশি রাশি সোনালী ধানে ভরে উঠবে কৃষাণীর শূন্য গোলা। ধান বিক্রিতে পরিশোধ হবে ঋণের দেনার বোঝা, মিটাবে সংসারের ভরণপোষণ, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও নতুন জামার বায়না, কৃষাণীর গায়ে জড়াবে নতুন শাড়ি।
দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক সাইফুল ইসলাম তার সাতবিঘা জমিতে এবার আমন ধান চাষ করেছেন। সুষ্ঠু সবল সবুজ ধানের চারাগুলো হাতড়াচ্ছিলেন তিনি। এমন সুন্দর চারা দেখে তার মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে। প্রত্যুষে কাক ডাকা ভোরে খেতের আইলে- আইলে ঘোরে ধান ফলানোর স্বপ্নে বিভোর। সন্তানের মতো স্নেহের স্পর্শে ধানের চারায় পরিচর্যা করে কাটছে কৃষকের দিন। কৃষাণি ধানের আগমনী বার্তায় ধানের গোলা, কুলো, খাঁচা ইত্যাদি গোছানোর কাজে ব্যস্ত।
এ বছর সার ও জ্বালানি তেলের কৃতিম সংকট দেখা দিলেও আমন ধানের আবাদ কমেনি। এমনকি খুবই ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমন প্রতি বিঘায় অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান উৎপাদন হবে বলে জানান তিনি।
উপজেলার নওপাড়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক ইদ্রিস আলী, জয়নাগর গ্রামের মুনসুর রহমান, আলীপুর গ্রামের আলতাফ, মাড়িয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম, কিশমতগণকৈড় গ্রামের আব্দুল মজিদ মাস্টারসহ অনেকেই বলেন, এবছর সারের কিছুটা কৃতিম সংকট দেখা দিলেও সেটা বাজারে উচ্চ বাজার মূল্যে পাওয়া যায়। তবে এটা প্রকৃত স্যারের সংকট নয়। সার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এ সংকটের প্রভাব পড়েছে। তারপরেও ফসলের চেহারা অনেক সুন্দর হয়েছে। সবল-সতেজ ধানের গাছ দেখে মনে হয় ধানের ব্যাপক ফলন হবে।
তারা আরও বলেন, পুকুরে কারণে আমরা অনেক ধানের জমি হারিয়ে ফেলেছি। যার ফলে এ অঞ্চল আমন চাষের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ভালোভাবে এ ফসল ঘরে তুলতে পারলে তাদের সারা বছরের চাহিদা পূরণ হয়। এ কারণেই আমনকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখে এ অঞ্চলের চাষিরা।
তবে কৃষকদের দাবি, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে যে পরিশ্রম আর ব্যয় করা হয়, সে তুলনায় ধানের মূল্য তারা পাচ্ছেন না । তাদের দাবি সরকার যেমন করে সার-বীজ, কীটনাশক ও বিদ্যুতের ঘাটতি মিটিয়েছে, তেমনই ধানের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করলে প্রান্তিক চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচে যাবে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর উপজেলায় ৭হাজার তিনশ’ হেক্টর জমিতে আভন ধানের আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি পরিমাণে ধান আবাদ করেছে কৃষক। এবার এখন পর্যন্ত বোরো চাষে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়নি। আবহাওয়া অনুক’লে রয়েছে। সার, বীজ ও বালাইনাশক সংকট ছিল না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা জানান, এবছর উপজেলায় ৪ হাজার ৮শত ৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এবছর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪হাজার ৬শত হেক্টর আমনের আবাদ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চলতি মৌসুমে আমন ধানে আবাদ বেশি হয়েছে। গত বছরের ৪হাজার ২ শত আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আমন চাষ হয়েছিল ৪হাজার ৬শত হেক্টর জমিতে। গত দুই মৌসুমে এই উপজেলা আমনের আবাদ লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে বেশি চাষ হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও কোনো প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে উপজেলায় বলে জানান তিনি।