পাবনা প্রতিনিধি ; পাবনা সদর উপজেলার দুবলিয়ায় দশদিনব্যাপী মেলার হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি অনার্স কলেজ অংশের আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। তবে মেলার দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংশের মেলা চলছে। বন্ধের পর কলেজ অংশের এই মেলা নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ, মেলা কমিটির সভাপতি স্থানীয় চেয়ারম্যানের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। যে ১৬টি শর্তে মেলা চালানোর অনুমতি দিয়েছে প্রশাসন তার বেশ কয়েকটি শর্ত মানছে না আয়োজক কমিটি। অনুমোদন না থাকায় মেলা উদ্বোধনের পাঁচদিন পর বৃহস্পতিবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে পাবনা সদর উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনার (এসিল্যান্ড) শওকত মেহেদী সেতুর নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের এক টিম অভিযান চালিয়ে মেলার এই অংশ বন্ধ করে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে এসিল্যান্ড শওকত মেহেদী সেতু বলেন, ‘মেলা নিয়ে জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে অভিযোগ আসায় স্যারের নির্দেশে আমরা গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করি। মেলা কর্তৃপক্ষ স্কুল অংশের অনুমোদন দেখাতে পারলেও, কলেজ অংশের কোনও অনুমোদন দেখাতে পারেনি এবং এটির অনুমোদন ছিলও না। এজন্য আমরা মেলাটি বন্ধ করে দিয়েছি। এছাড়াও সেটাকে শিল্প মেলার নাম উল্লেখ করে ব্যবহার করা হচ্ছিল, কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের কোনও অনুমোদন নেই। পরে সেটিও তারা সংশোধন করেছে।’
কীভাবে কলেজ অংশে মেলা বসলো এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল। স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষের পৃথক আবেদনের কথা থাকলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ কলেজ কর্তৃপক্ষকে বলেছিল কলেজ অংশের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। তাদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটা হয়েছিল।’
বিষয়টি চরতারাপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আ.লীগ নেতা সিদ্দিকুর রহমান খানের দিকে ঠেলে দিয়ে দুবলিয়া হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চরতারাপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান খানের অনুরোধে কলেজ প্রাঙ্গণে মেলা বসার অনুমোদন দিয়েছিলাম, এখন অনুমোদন ছিলো কিনা আমি জানতাম না। চেয়ারম্যানসহ এলাকার গণমান্য ব্যক্তিবর্গ বলায় মেলা বসতে দিয়েছিলাম।’
তবে চেয়ারম্যানের পাল্টা অভিযোগ কলেজের অধ্যক্ষের দিকে। মেলা কমিটির সভাপতি, চরতারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সদর উপজেলা আ.লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘আমি নিষেধ করেছিলাম কিন্তু কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা অনুরোধ করলো যে, ‘কলেজের উন্নয়নকল্পে টাকাটা কাজে লাগাবো’। তাদের অনুরোধ সেখানে মেলা বসানো হয়েছিল।’
জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর রাতে ১৫ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী দুবলিয়ার উদ্বোধন করেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স। ১৬টি শর্তে এই মেলার অনুমোদন দেয়া হলেও কোনও শর্তই সেখানে মানা হচ্ছে না। মেলা শুরুর কয়েকদিন পর কলেজের পেছনে জুয়া খেলা নিয়ে মেলা কমিটির সেক্রেটারি রইস খানের ছেলে ছাত্রলীগ নেতা সিয়াম আরেক ছাত্রলীগ নেতা কাওছারকে মারধর করে। এ নিয়ে উত্তেজনাও চলছিল। বৃহস্পতিবার সকালেও মেলায় জুয়া খেলা নিয়ে দুইপক্ষের চরম উত্তেজনা শুরু হয়েছিলো। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এদিকে মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাদুল্লাহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রইস খানের ক্ষোভ সাংবাদিকদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিকরা অভিযোগ দিয়েছেন ‘ইয়ে তিয়ে অমক তমক’, এজন্য প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। আপনারা জাতির বিবেক, কিন্তু শত শত মানুষের কথা চিন্তুা করলেন না, আপনাদের জন্য দেশে আর কিছু হবে না, মানুষের জন্য আর কিছু হবে না।’
ছেলের সঙ্গে কাওছারের ঝামেলা বিষয়ে রইস খান বলেন, ‘আপনাদের মতো এই সাংবাদিকদের জন্য দেশের আজকে এই অবস্থা। আপনারা এসে দেখে যান, আমার ছেলে জুয়া খেলে কি-না। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
এ বিষয়ে আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, ‘অনুমোদিত জায়গার বাহিরে হওয়ায় ওই অংশ ডিসি স্যারের নির্দেশে বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মেলা সম্পূর্ণ ফ্রেস মেলা, কোনও ঝামেলা নেই, কোন ধরনের জুয়া নেই।’
দু’দিন আগেও মেলায় জুয়া খেলার অভিযোগে একজনকে আটক করে ছেড়ে দিয়েছিলেন এমন প্রশ্ন করা হলে সঠিক জবাব দিতে পারেননি তিনি। তিনি বলেন, এসব বিষয় আমার জানা নেই। কোন কিছু হলে ফাঁড়িকে বলা আছে তারা ব্যবস্থা নিবে।
দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, মেলার কারনে স্কুলের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। সকাল আটটা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। কিন্তু বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ছুটির ঘন্টা দেয়া হয়। ৬ ঘন্টা ক্লাস করার কথা থাকলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩ ঘন্টা পাঠদান করে ছুটি দিচ্ছে। এছাড়া মেলায় উচ্চ স্বরে মাইক বাজাতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে গেলে তারা কোন কথা বলেননি। সাংবাদিকরা স্কুলে যাওয়ার সাথে সাথে প্রধান শিক্ষক স্কুল থেকে সটকে পড়েন। বন্ধ করে দেন তার মুঠোফোন।
বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে সময় পরিবর্তন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে জেলা শিক্ষা অফিসারের অনুমোদন প্রয়োজন আছে। এছাড়াও ৬ ঘন্টা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা ও ক্লাস নিশ্চিত করতে হবে।
দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এ শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে স্থানীয় একাধিক সচেতন মানুষের অভিযোগ। মেয়েদের দোতলা ভবনের সামনে পথ আটকে দিয়ে স্টল বসানোর কারনে অনেক কষ্ট করে তাদের ক্লাসে যাওয়া আসা করতে হচ্ছে।
এদিকে হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি অনার্স কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, ক্লাসের কোন সমস্যা হচ্ছে না। দেড়টা পর্যন্ত ক্লাস চলছে। মাঠের মধ্যে উচ্চ শব্দে গান বাজনা চলছে। মাঠে শিক্ষার্থী আছে, ক্লাসে নয়। এমন চিত্রে অধ্যক্ষ সঠিক কোন জবাব দিতে পারেননি। কয়েকজন শিক্ষক বলেন, এমন আয়োজন সামান্য সমস্যা হবেই। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের স্বার্থে একটু ছাড় দেয়া হয়েছে।
কয়েকজন ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থী জানায়, কলেজ মাঠে যখন নৌকা ঠেলা, নাগর দোলা, ট্রেন রাইড, ম্যাজিক, ফুসকা, আচার, চাইনিজসহ বিভিন্ন দোকানের পসরা। সাথে হৈ-হুল্লোড় আর ডিজে গান বাজে সেখানে কি ক্লাসে মন থাকে।
পাবনা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্যাস্ট (এডিএম) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘১৬টি শর্তের প্রেক্ষিতে দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দশদিনের মেলা করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল, অনুমোদনহীন জায়গার মেলা বন্ধ করা হয়েছে। বাড়তি কোন মাঠ ব্যবহারের সুযোগ নেই। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে মেলা মনিটরিং করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর কোন ধরণের শর্ত ভঙ্গ হলে তাৎক্ষণিকভাবে মেলা বন্ধ করে দেয়া হবে।’