রোববার সকাল ৯টা। কদমরসুল মহাসড়কের পাশে বিএম ডিপোতে ঢোকার সময় শোনা যায় বিকট আওয়াজ। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। সামনে এগোতেই চোখে পড়ে সড়কের উভয় পাশে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবহিনীর সারি সারি গাড়ি। ডিপোর প্রবেশ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স। প্রথম দেখায় যে কারো মনে হবে বিএম ডিপোটি যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন!
কিন্তু তখনও আগুন নেভাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের ফাইটাররা। ডিপোর বাম পাশের টিনশেডের কাছে যেতেই দেখা যায় গাউছিয়া কমিটির ১৫ সদস্যের একটি টিম ডিপোর ভেতর থেকে পুড়ে যাওয়া এক শ্রমিকের লাশ নিয়ে আসছেন। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে আবার দেখা মেলে গাউছিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের। হাতের দিকে চোখ পড়তেই আবার দেখা মিলল আরেকটি লাশের। কার লাশ, এটি বোঝার কোনো উপায় ছিল না। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া এ লাশের এককোণে চোখ পড়তেই বুঝা যায় লাশটি এক ফায়ার কর্মীর কারণ তার শরীরের এক কোণে লেগে ছিল চিরচেনা সেই পোশাকের টুকরো। লাশ আসছে, লাশ। হুইসেল বাজাচ্ছে সেনাবাহিনী। ক্যামরা নিয়ে ছুটছেন গণমাধ্যম কর্মী। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনের চোখে দেখা যাচ্ছিল ঝিলিক!। এই বুঝি দেখা মিলবে প্রিয়জনের লাশ। দু-এক কদম করে এগিয়ে আসছে লাশের কফিন। এগিয়ে আসছেন স্বজনরাও। কিন্তু গেটের কাছে আসতেই বড় হয়ে উঠে কান্নার রোল। এই লাশ কার? এই লাশের স্বজন কে? এমন প্রশ্ন বাতাসে ভাসলেও উত্তর মিলে না আর। লাশ চেনা যায় না। বিভৎসতার কারণে লাশের দিকে তাকাতেও পারছে না অপেক্ষমাণ স্বজনরা। লাশের কফিন তাই তোলা হয় গাড়িতে। সাইরেন বাজিয়ে চমেক হাসপাতালের দিকে ছুটতে থাকে নতুন আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সের পাশেই দেখা মিলে আগুন নেভানোর গ্যাস সিলেন্ডার। ১০-১২টি বোতল ফ্লোরে পড়ে আছে। সামনে যেতেই শেডের ভেতর থেকে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ভেতরে ঢুকতেই শেডের ভেতর থাকা রপ্তানি পণ্য মিটমিট করে জ্বলতে দেখা যায়। আরেকটু এগোলে চোখে পড়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি পুড়ে অঙ্গার হয়ে পড়ে আছে। এই গাড়িতে করে আগুন নেভাতে যাওয়া ৯ ফায়ারম্যান মারা যান। এমন লন্ডভন্ড পরিস্থিতির দেখা মেলে বিএম ডিপোতে। দিন গড়াতে থাকে। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করতে থাকেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। কিন্তু ডিপোর ডান পাশে থাকা কন্টেইনারে জ্বলতেই থাকে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর জনবল বেলা বাড়তেই বৃদ্ধি করা হয়।
সকাল থেকে ঘটনাস্থলে ঘুরে ঘুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করতে থাকেন চট্টগ্রাম জেলার এসপি রশিদুল হক। ডিসি মমিনুর রশিদ দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে থেকে সবকিছু তদারকি করেছেন। সময় বাড়তে থাকে সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে লাশের সারি।
কিছু সময় পর পর গাউছিয়া কমিটির দুইশ সেচ্ছাসেবক ডিপোর ভেতর থেকে তল্লাশি করে পুড়ে যাওয়া একের পর এক লাশ ডিপো থেকে বের করে আনতে থাকেন। এভাবেই সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসেন বিএম কন্টেইনার ডিপোতে। সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে লাশের সারি।