প্রচণ্ড গরমসহ নানা ভোগান্তি নিয়েই নাড়ির টানে গ্রামের উদ্দেশে ছুটছেন কর্মব্যস্ত মানুষ। শুক্রবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হলেও বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখ লাখ মানুষ। বাস, রেল, লঞ্চসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে ছুটছেন ঘরমুখো মানুষ। হাজার হাজার যানবাহনের বাড়তি চাপে মন্তর হয়ে পড়েছে সড়ক-মহাসড়কগুলো। এ দিকে অগ্রিম টিকিট না করা যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে দূরপাল্লার লোকাল বাসগুলোর বিরুদ্ধে। যাত্রীরা বলছেন, ছুটি নিশ্চিত না হওয়ায় তারা অগ্রিম টিকিট কাটতে পারেননি। কিন্তু যখন ছুটি নিশ্চিত হয়েছে তখন আর টিকিট পাননি। গাবতলী টার্মিনালে গেলে দূরপাল্লার বড় কোনো কোম্পানির বাসে তারা উঠতে পারেননি। বাধ্য হয়ে দূরপাল্লার লোকাল বাসে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ দিকে প্রচণ্ড গাড়ির চাপে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে পদ্মা নদীর শিমুলিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের ২১টি জেলার ঘরমুখো মানুষ। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই চাপ বাড়তে থাকে ঘাট দু’টিতে। কিন্তু ওই রাত থেকে গতকাল সারাদিন শত শত যানবাহন ও হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। তবে নৌপরিবহন মন্ত্রী যাত্রীদের পাটুরিয়াঘাট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, বিরতিহীনভাবে ফেরি চলাচল করলে ও কয়েক গুণ বেশি যানবাহন ও মানুষের ঢল নামায় গাড়ির চাপ রয়েছে। পদ্মা সেতুতে একাধিকবার ফেরিতে আঘাত হানার পর শিমুলিয়া ঘাটে বড় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। যার কারণে এই ঘাটে ফেরির সংখ্যাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত চাপ দেখা দেয়ায় কয়েকটি ফেরিতে শুধু মোটরসাইকেল পার করা হয়েছে। পকেট কাটছে দূরপাল্লার লোকাল বাস : বেসরকারি চাকরিজীবী শাহ আলম বলেন, অফিসে ছুটি নিশ্চিত না হওয়ায় বাস কিংবা রেলের অগ্রিম টিকিট কাটেননি। কিন্তু বৃহস্পতিবার হঠাৎ ছুটি মঞ্জুর হয়, যার কারণে আজ গ্রামে যাবে বলে গাবতলী বাস টার্মিনালে আসেন। কিন্তু সেখানে হানিফ, শ্যামলী, এনার মতো বড় কোনো পরিবহনের টিকিট পাননি। অবশেষে ঢাকা নাটোর রুটে চলাচলকারী একটি লোকাল বাসের টিকিট বাড়তি দামে কিনে ঈদ যাত্রা শুরু করেন তিনি।
যাত্রীদের অভিযোগÑ বড় বড় পরিবহনের বাসের টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন লোকাল বাসের মালিকরা। ক্ষেত্র বিশেষে তারা, ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। শাহ আলম বলেন, তার বাড়ি নাটোর। সেখানে যাওয়ার বাস পেতেই গাবতলীতে আসা। ভালো বাসের টিকিটগুলো আগেই শেষ হয়ে গেছে জানি তবুও যদি পাওয়া যায়, অথবা কেউ যাত্রা বাতিল করে টিকিট ফেরত দেয়, এই আশায় ভালো বাসগুলোর কাউন্টারে আগে খোঁজ নিয়েও লাভ হয়নি। টার্মিনালের একটু সামনের দিকে উত্তরবঙ্গের দূরপাল্লার লোকাল বাস পাওয়া যায়। তাই এখানে এসে বাস পেলেও ভাড়া অনেক বেশি। ভালো বাসগুলো যেখানে ৬০০ টাকা সেখানে লোকাল বাস ভাড়া নিচ্ছে ৮০০ টাকা করে। অন্য সময়ে এই ভাড়া নেয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। একইভাবে পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলাগামী লোকাল বাস গাবতলী থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। সব বাসের যাত্রীদের একই অভিযোগ, সুযোগ বুঝে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। শিমুলিয়া-পাটুরিয়ায় মানুষ ও গাড়ির ঢল : মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ঘাটে দীর্ঘ গাড়ির লাইন দিয়েছে। আটকা পড়েছে পাঁচ শতাধিক গাড়ি। ঘাটে ফেরি থাকলেও আনলোড করা যাচ্ছে না। ঘরমুখো মানুষ ও যানবাহনের চাপ ও দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। গতকাল ভোর থেকে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও মাঝিকান্দি নৌরুটে পদ্মা পাড়ি দিতে ঘাটে আসছে হাজার হাজার মানুষ। বাড়তি যানবাহনের চাপে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন দেখা যায়, ফেরি কম থাকায় বিপুলসংখ্যক যানবাহন পারপারে বেশি সময় লাগছে। এতে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ঘাটের পার্কিং ইয়ার্ড থেকে পন্টুনের অভিমুখ পর্যন্ত যানবাহনের লম্বা সারি। স্পিডবোট ও লঞ্চঘাটে যাত্রীদের চাপ গতকালকের তুলনায় চারগুণ। একটি ফেরি ঘাটে ফিরলেই ঘরমুখো শত শত মানুষ ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভিআইপি কর্মকর্তা বলেন, নিজস্ব প্রাইভেট কারে শ^শুরবাড়ি যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অবস্থাপনায় হতাশ। এবরোথেবড়ো করে গাড়ি পার্কিং করে রাখা এবং গাড়ি থেকে টাকা উত্তোলন করে গোপনে সিরিয়াল ব্রেক করে গাড়ি ফেরিতে উঠানোর প্রত্যক্ষদর্শী বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘাটে গাড়ি নিয়ে আসা আরো অনেক ভিআইপি লোকজন অভিযোগ করে, যাত্রীবাহী গাড়ি ঘাটে এলেই মাঠের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। পরে বুঝে বুঝে টাকা পয়সা নিয়ে গাড়ির সিরিয়াল ফেরিতে দেয়া হয়। এ দিকে অনেক মোটরসাইকেল ফেরিতে উঠতে না পেরে বিক্ষোভ করেছে। তাদের বিক্ষোভের মুখে কয়েকটি ফেরিতে শুধু মোটরসাইকেল পার করে দেয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন সকাল থেকে কাজ করলেও তাদের পাশ কাটিয়ে বিআইডব্লিউটিসি ঈদে যাত্রীবাহী প্রাইভেট কার ও বাস থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে সিরিয়াল দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই সকল অবস্থাপনার কারণেই যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়া লঞ্চ ও স্পিডবোটেও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
এ দিকে তীব্র গরমে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে মানুষকে।
পদ্মা সেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসাইন জানান, আমরা চেষ্টা করছি যাত্রীদের ভোগান্তি এড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পারাপারের জন্য। অনেকক যানবাহন ও যাত্রীরা আসছেন। বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া নদী বন্দর নৌ নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন জানান, এ রুটে আরো পাঁচটি লঞ্চ ও তিনটি স্পিডবোট বেড়েছে। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও মাজিকান্দি দুই রুটে ৮৫টি লঞ্চ ও ১৫৫ স্পিডবোট সচল রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) আশিকুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার পাঁচ হাজার গাড়ি পারাপার করেছি। ১০টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। আমরাতো একসাথে সবাইকে পার করতে পারব না।
আজ সকাল থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিভিন্ন ধরনের শত শত যানবাহন ও মানুষের ঢল নামে। ছোট গাড়ি ও বড় গাড়ি পারাপারের জন্য আলাদা রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। বড় গাড়িগুলো প্রধান সড়কে থাকলেও ছোট গাড়িগুলো পাশের গ্রামের সড়ক ব্যবহার করছে। প্রতিটি ছোট গাড়ি ফেরির জন্য ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নৌপথে ছোট-বড় মিলে চলছে ২১টি ফেরি এবং ২০টি যাত্রীবাহী লঞ্চ দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করছে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ।
বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন পাটুরিয়া ফেরিঘাটে দেখা গেছে, ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় থেকে নালী বাজার ছাড়িয়ে গেছে ছোট গাড়ির লাইন। এতে পাঁচ শতাধিক ছোট গাড়ি নৌপথ পারাপারের জন্য অপেক্ষমাণ থাকতে দেখা গেছে। পাটুরিয়ারমুখী নালী বাজারে আলাপকালে ছোট গাড়ির চালক হুমায়ুন কবির বলেন, ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সকাল ৮টার দিকে টেপড়া এলাকার রোড দিয়ে ছোট গাড়ির জন্য নির্ধারিত সড়কে ঢোকেন। প্রায় ৩ ঘণ্টা এই পর্যন্ত বসে আছেন। তবুও ঘাটের দেখা মিলছে না। প্রাইভেট কারে বরিশালগামী মো: হানিফ আলী বলেন, ঈদের সময় পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ভোগান্তিতে পড়া নতুন নয়। তবুও ঈদের খুশি ভাগাভাগির আনন্দের কাছে এই ভোগান্তি কিছুই নয়। তবে তীব্র গরমের কারণে গাড়ির ভেতরে শিশু আর নারীদের কষ্ট বেশি হচ্ছে। তবুও বাবা-মায়ের সাথে ঈদ করতে পারছি, তাতেই অনেক খুশি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শাহ মো: খালেদ নেওয়াজ বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথের পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেশি থাকলেও খুব বেশি ভোগান্তি হচ্ছে না। ঘাটে আসার পর কিছুটা সময় অপেক্ষার পরেই ফেরিতে উঠতে পারছে।
তিনি বলেন, সকাল থেকে ঘাট এলাকায় ছোট গাড়ির চাপ রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ফেরি থাকায় এসব যানবাহন ও যাত্রীরা তেমন ভোগান্তি ছাড়াই নৌপথ পারাপার হচ্ছে। লঞ্চঘাটের সুপারভাইজার পান্না নন্দি লাল বলেন, সকাল থেকেই লঞ্চঘাটে সাধারণ যাত্রীদের বেশ চাপ রয়েছে। তবে যাত্রীরা লঞ্চঘাটে আসামাত্রই টিকিট নিয়ে লঞ্চে উঠে নদী পার হচ্ছে। ঘরমুখী এসব যাত্রীর নিরাপদে নৌপথ পারপারে ২০ লঞ্চ চলাচল করছে।
নৌ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য:
কোনো ভিআইপিকে আগে সিরিয়াল দেয়া হবে না। সবাইকে সিরিয়াল মেনেই পদ্মা পাড়ি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। আজ দুপুরে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাট পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সামিম আল রাজী, অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমান ও মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন।
মন্ত্রী বলেন, এবারের ঈদে যাত্রী পারাপারের জন্য বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথকে। ফেরিঘাট ঈদে ঘরমুখী মানুষের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে ২৫টি ফেরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফেরি দিয়ে যানবাহন ও যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। আমরা কিছুদিন আগে যাত্রীদের বলেছিলাম, আপনারা পাটুরিয়া নৌপথ ব্যবহার করেন। তাহলে আপনাদের ভোগান্তি কম হবে।
আমাদের নির্দেশনা না শুনে অনেকেই শিমুলিয়া ঘাটে এসেছেন। ফলে সাহরির পর থেকে শিমুলিয়া ঘাটে প্রবলচাপ পড়েছে। আমাদের বিআইডব্লিউটিএ, টিসি, পুলিশ সদস্যরা চাপ নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার রাত থেকে কাজ করছে। মন্ত্রী আরো বলেন, গতকাল থেকে গার্মেন্ট বন্ধ হচ্ছে। বিকেলের পর থেকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে চাপ আরো বাড়বে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে আমরা তাদের অনুরোধ করছি। তারা যেন বিকল্প নৌপথ হিসেবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার করেন। এ নৌপথে ১০টি ফেরি চলাচলের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার স্বার্থে সবচেয়ে ভালো ফেরিগুলো শিমুলিয়া-বাংলাবাজার-মাঝিকান্দি নৌপথে দেয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা এ নৌপথে এখন ফেরি চলছে। এ ফেরিগুলো এ নৌপথের জন্য যথেষ্ট হবে।