নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের ক্ষেত্রে কোনো দলীয় সরকারের সুবিধাভোগী কেউ যাতে স্থান না পায় তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির সঙ্গে আজ শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা এমন তাগাদা দেন। সকাল ১১টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের জাজেস লাউঞ্জে বৈঠকটি শুরু হয়। প্রথম ধাপে বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশিষ্টজনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রসঙ্গে সাবেক বিচারপতি মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, তারা যেন স্বাধীনতার স্বপক্ষের হন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণা করেন তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈঠকে সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। যাদেরই বাছাই করা হোক, তাদের সৎ ও যোগ্য হতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে যেন আর্থিক অনিয়মের কোনো অভিযোগ না থাকে। এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি মাহফুজা খানম বলেন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের সৎ ও নিষ্ঠাবানদের বাছাই করতে হবে। আগামী দিনের নির্বাচন কমিশন যাতে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ৫০ বছরের অগ্রযাত্রাকে সুদৃঢ় করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দলীয় সরকারের সুবিধাভোগী কেউ যাতে স্থান না পায়। সরকারি বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন এমন কেউ যাতে মনোনয়ন না পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে যে নাম পাঠানো হবে তা যেন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, যাতে জনগণ বুঝতে পারে প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি বিশেষ কোনো অনুরাগ আছে কিনা। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য তাদের যোগ্য হতে হবে। সার্চ কমিটির কাছে আমাদের সবার একটা বিষয়েই জোর ছিল যে, আগের কোনো সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগীরা যেন নতুন নির্বাচন কমিশনে সুযোগ না পায়। বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব নাম জমা দিয়েছে সার্চ কমিটিকে তা প্রকাশ করতে বলেছি। নামগুলো প্রকাশ করলে জানা যাবে আসলেই রাজনৈতিক দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন চায় কি না।
দেশের ২৫ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সাথে বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন সংক্রান্ত সার্চ কমিটি। শনিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা ২৫ মিনিট থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশের ১৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা হলেন, বিশিষ্ট আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এ এফ হাসান আরিফ, ফিদা এম কামাল, মনসুরুল হক চৌধুরী, এম কে রহমান, ড. শাহদীন মালিক, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ড. মাকসুদ কামাল, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মাহফুজা খানম, ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান। দুপুর ১টার দিকে দ্বিতীয় বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর আড়াইটার দিকে। দ্বিতীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আজকের পত্রিকার সম্পাদক ড. গোলাম রহমান, যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, একাত্তর টেলিভিশনের সিইও মোজাম্মেল বাবু, ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দৈনিক জাগরণের সম্পাদক আবেদ খান, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম, দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক স্বদেশ রায় ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সুপ্রিম কোর্টের কনফারেন্স রুমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সার্চ কমিটির প্রধান আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সার্চ কমিটির সদস্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মুসলিম চৌধুরী, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক। বৈঠক থেকে বের হয়ে বিশিষ্ট নাগরিকগণ গণমাধ্যমে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে বৈঠক হয়েছে। সেখানে তারা আগামী ইসি গঠন বিষয়ে তাদের স্ব স্ব মতামত দিয়েছেন। ইসি যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ মোট ২৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সার্চ কমিটির কাছে নাম প্রস্তাব করেছে। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে নাম দেয়ার অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছিল ইসি গঠন সংক্রান্ত সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি। সার্চ কমিটির সাচিবিক দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব শফিউল আজিম শুক্রবার বিকেল ৫টার পর সাংবাদিকদের বলেন, ২৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পেয়েছেন। এ ছাড়া ছয়টি পেশাজীবী সংগঠন থেকে প্রস্তাব এসেছে। এই পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনও আছে। এর বাইরেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশ ও বিদেশ থেকে অনেক বড় সংখ্যায় প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন যুগ্ম সচিব শফিউল আজিম। এগুলো এসেছে মূলত ই-মেইলে। শফিউল আজিম বলেন, নামগুলোর তালিকা করে এখন সার্চ কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হবে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানায় গত বুধবার চিঠি দিয়ে নাম দেয়ার অনুরোধ করে সার্চ কমিটি। চিঠিতে প্রতিটি দলকে শুক্রবার বিকেল ৫টার মধ্যে অনধিক ১০ জনের নাম (প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি) পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনে দলগুলোর যে কার্যালয়ের ঠিকানা দেয়া আছে, সে ঠিকানায় ওই চিঠি দেয়া হয়। নাম জমা দেয়ার শেষ দিনে আওয়ামী লীগের পক্ষে শুক্রবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গিয়ে নাম জমা দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অধ্যাপক সেলিম মাহমুদ ও উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান প্রস্তাব করা নামগুলো খামে করে দিয়ে আসেন। শুক্রবার শেষ দিনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, তরীকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি (জেপি)সহ বেশিরভাগ দল নাম জমা দেয়। বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ (জাসদ) অন্তত পাঁচটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সার্চ কমিটির কাছে নাম প্রস্তাব করে জমা দেন। ইসি গঠনে যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে আজ শনিবার দুই দফায় এবং আগামীকাল রোববার বিশিষ্টজনদের সাথে বৈঠক করছেন সার্চ কমিটি। ইতিমধ্যে বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী আজ প্রথম দিনে দুই দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাল রোববারও বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে বৈঠকে মিলিত হবে সার্চ কমিটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়ার জন্য নাম সুপারিশ করতে সার্চ কমিটি গঠন করে শনিবার ৫ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২-এর ধারা ৩ মোতাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়ার জন্য আইনে বর্ণিত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করার লক্ষ্যে অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি গঠন করা হলো। ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ অনুযায়ী সার্চ কমিটি (অনুসন্ধান কমিটি) গঠন করে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। এই কমিটি ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ মোতাবেক দায়িত্ব ও কার্যাবলী সম্পন্ন করবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুসন্ধান কমিটির কার্য সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মনোনীত করার পর রাষ্ট্রপতি তা চূড়ান্ত করেন। তবে এবার নতুন আইনানুযায়ী সার্চ কমিটি গঠন করা হলো। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে।