খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ ৪ জন ছাত্রকে চিরতরে কুয়েট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৪০ জনের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। শাস্তি পাওয়া ৪৪ জনের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুয়েটের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. আনিসুর রহমান ভূঞা সিন্ডিকেট সভা শেষে ব্রিফিংয়ে জানান, বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় মোট ৪৪ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং ছাত্র শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট এই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এতে সন্তুষ্ট নয় ড. সেলিমের পরিবার। এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ছাত্র। কুয়েট রেজিস্ট্রার মো. আনিসুর রহমান ভূঞা জানান, কুয়েটের ৪ ছাত্র সাদমান নাহিয়ান সেজান, হাসান আবদুল কাইয়ুম, মো. কামরুজ্জামান রাজ্জাক ও রিয়াজ খান নিলয়কে কুয়েট থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। মো. তাহমিদুল হক ইশরাক, মাহমুদুল হাসান, মো. সাদমান সাকিব, মাহিন মুনতাসির, এ এস এম রাগিব আহসান মুন্না, মীর জামিউর রহমান ও রুদ্রনীল সিংহ শুভকে দুই শিক্ষাবর্ষ বহিষ্কার, আবাসিক হল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। কুয়েটের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কুয়েটের শৃঙ্খলা পরিপন্থি কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে না মর্মে এই ৭ জন ও তাদের অভিভাবকদের লিখিত মুচলেকা প্রদান করতে হবে। কুয়েটের ১ ছাত্র আনিকুর রহমানকে ১ শিক্ষাবর্ষ বহিষ্কার, আবাসিক হল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাকে এবং তার অভিভাবককে মুচলেকা দিতে হবে। কুয়েটের ২২ ছাত্র ফয়সাল আহমেদ রিফাত, ইমরান হোসেন আওয়াল, মো. খালিদ সাইফুল্লাহ শুভ্র, মো. ফাইয়াজ রহমান, নূর মোহাম্মদ, মো. নাইমুর রহমান অন্তু, মো. সাবির জোয়ারদার, মো. মাহবুবুর রহমান রাফি, মো. আতিকুর রহমান, মো. সাদিকুল ইসলাম, নাজমুস সাকিব সিফাত, মো. গোলাম কিবরিয়া, ওসমান ফারুক, সাগর তরফদার, প্রান্ত কর্মকার, সাফাত হাসান, মানিক কুমার সরকার, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. মুহিব্বীন হোসেন সরদার, মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, সাফায়েত মাহবুব ও মো. আনোয়ার হোসেন সাকিবকে এক শিক্ষাবর্ষ বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এই শাস্তি আপাতত স্থগিত থাকবে। ভবিষ্যতে আবার কোনো অসদাচরণ করলে এই শাস্তি কার্যকর হবে। তাদেরকে আবাসিক হল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া এই ২২ জন ও তাদের অভিভাবকদের লিখিত মুচলেকা দিতে হবে। কুয়েটের ১০ ছাত্র আহসানুল আবেদীন, কবির হোসেন, মো. শুভ মন্ডল, শাহরিয়ার আহমেদ মুশফিক, ফয়সাল কবীর ফাহিম, শাফিন আহমেদ অনন্ত, মো. আদনান ইসলাম, সাকিব সরদার, সানজিদুল ইসলাম ও মো. সাদাফ হেলালকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই ১০ জন ও তাদের অভিভাবকদের মুচলেকা প্রদান করতে হবে। কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে কোনো-মিছিল করতে হলে আগে থেকে ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া ক্যাম্পাস থেকে সকল ছাত্র সংগঠনের ব্যানার, প্যানা, ফেস্টুন ও পোস্টার অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ড. সেলিম প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পাবেন। তাকে সেই টাকা দ্রুত দেওয়ার জন্য কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া ড. সেলিমের স্ত্রী কুয়েটের চাকরির জন্য একটি আবেদন করেছেন। কিন্তু তার সরকারি চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে, তার বয়স ৩৭ বছর। তার চাকরির বিষয়টি পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপন করা হবে। সিদ্ধান্তে ক্ষোভ পরিবারের কুয়েট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ড. সেলিমের স্ত্রী সাবিনা খাতুন।
তিনি সমকালকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত আমি মানি না। যাদের জন্য আমার স্বামীর জীবন গেছে, আমি তাদের প্রত্যেকের ফাঁসি চাই। যাদের জন্য তার জীবন গেছে, এত অল্পতে তারা কেন ছাড় পাবে?’ তিনি বলেন, তার বাবা নেই, স্বামীকেও হারিয়েছেন। এখন পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। তার একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস আনিকা (৬) প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার লেখাপড়া ও ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে গেছে। তিনি মেয়েকে কিভাবে লেখাপড়া করাবেন? মেয়ের ছোট ছোট শখ পূরণেরও সামর্থ্য তার নেই। তিনি আরও বলেন, তিনি মামলা দায়েরের জন্য কুয়েট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
অভিযুক্ত ছাত্ররা যাবে আদালতে
স্থায়ী ও সাময়িক বহিস্কার ও বিভিন্ন শাস্তির বিষয়ে কুয়েট ছাত্রলীগ নেতারা ক্ষোভ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কুয়েটের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আদালতে যাবেন।
কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান সমকালকে বলেন, ‘নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো। ইতোমধ্যে আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আইনীভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে।’ শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরবেন কি না, সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার। কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. প্রতীক চন্দ্র বিশ্বাস সমকালকে জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা আহবান করা হয়েছে। এই সভায় তারা কর্তৃপক্ষের গৃহীত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে ক্লাসে ফেরা-না ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। কুয়েটের শিক্ষকদের অভিযোগ, কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান তার মনোনীত ছাত্রকে লালন শাহ হলের ডাইনিং ম্যানেজার নিযুক্ত করার জন্য হলের প্রভোস্ট ড. সেলিমকে চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। গত ৩০ নভেম্বর সেজান নেতাকর্মীদের নিয়ে আবারও ড. সেলিমকে চাপ প্রয়োগ এবং তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে বাসায় গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে ড. সেলিমের মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদে গত ১ ডিসেম্বর থেকে ক্লাস বর্জন শুরু করে শিক্ষক সমিতি। গত ৩ ডিসেম্বর সিন্ডিকেট সভায় কুয়েট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কুয়েটের হল খুলবে আগামী ৭ জানুয়ারি এবং ক্লাস শুরু হবে আগামী ৯ জানুয়ারি থেকে।