ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮১ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়া। আহতদের মধ্যে ৪৬ জনের চিকিৎসা চলছে এবং ১৬ জনকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। শনিবার দুপুরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রোগীদের সার্বিক পরিস্থিতি দেখার পর সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে ২১ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চারজনকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ১৫ জনের চিকিৎসা চলছে। দুজনকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আর একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের মধ্যে ৩২ জনের চিকিৎসা চলছে বরিশালে। সাত সদস্যের চিকিৎসক টিম পাঠানো হয়েছে। তারা সেখানে চিকিৎসা দিচ্ছেন। আমরা মনিটরিং করছি। সিনিয়র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়েছেন। আহতদের সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করা হচ্ছে। নিহতদের মরদেহ বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থাও হাসপাতালের পক্ষ থেকে করা হবে। গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ঝালকাঠির পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দেউরী এলাকায় সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। এতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। সুগন্ধা নদীতে লঞ্চ অগ্নিকাণ্ড, ৪১ জন নিহতের ঘটনায় মামলা: ঝালকাঠিতে গভীর রাতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লাগার ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। শনিবার সকালে গ্রাম পুলিশ মো: জাহাঙ্গীর হোসেন ঝালকাঠি থাকায় ওই মামলাটি দায়ের করেন। মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঝালকাঠি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: খলিলুর রহমান। তিনি জানান, সকালে গ্রাম পুলিশ মো: জাহাঙ্গীর হোসেন ঝালকাঠি থাকায় ওই অপমৃত্যুর মামলাটি দায়ের করেন। এ ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি। শনিবার সকাল ১১টায় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফায়েল হাসান, সদস্য সচিব বিআইডব্লিউটি এর অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম, নৌপুলিশ সুপার কফিল উদ্দিন, নৌ চলাচল বিভাগের মামুন অর রশিদ ও ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স এর উপ-পরিচালক তাইফুর আহমেদ এবং ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এই ৭ সদস্যর তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন। তারা লঞ্চটিতে আগুন লাগার কারণ, লঞ্চ কর্তৃপক্ষের কি ধরনের অবহেলা ছিল এই সব বিষয়ে তদন্ত করে সরকারের কাছে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এছাড়াও বিআইডব্লিউটি এর ৬ সদস্যের এবং জেলা প্রশাসক ৫ সদস্যর আরো ২টি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং তারাও তদন্তের কাজ শুরু করেছেন। এর আগে সকালে পুড়ে যাওয়া লঞ্চটি পরিদর্শনে গেছেন ঝালকাঠির তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তদন্ত কমিটির সদস্য ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: নাজমুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা পরিদর্শনে এসেছি। এখন পর্যন্ত পরিদর্শনে আছি। ইঞ্জিনরুমসহ পুরো লঞ্চটি দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলছি। প্রায় ৫০০ যাত্রী নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে এমভি অভিযান-১০ সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়। চাঁদপুর ও বরিশাল টার্মিনালে লঞ্চটি থামে এবং যাত্রী ওঠানামা করেন। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছালে রাত ৩টার দিকে এতে আগুন ধরে যায়। স্মরণকালের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ৮০ জনেরও বেশি যাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় অনেক যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্তে শুক্রবার তদন্ত কমিটি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে আহ্বায়ক করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বন্দর) মো: তোফায়েল ইসলামকে। নাজমুল আলম ছাড়াও কমিটির অন্য সদস্য বরিশাল অঞ্চলের পুলিশ সুপার (নৌপুলিশ) মো: কফিল উদ্দিন, নৌপরিবহন অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার তাইফুর আহম্মেদ ভূইয়া, ফয়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন ভুইয়া, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাপ) সংস্থার পরিচালক মামুন-অর-রশিদ ও বিআইডব্লিউটিয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম। এ কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ৩০ জনের জানাজা সম্পন্ন: সুগন্ধায় ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লাগার ঘটনায় নিহত ৩০ জনের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে বরগুনা সার্কিট হাউস মাঠে এ জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজার পর নিহতদের গণকবরে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ।এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তাদের মধ্যে চার জনের লাশ নিয়ে গেছেন স্বজনরা। পরে আরো পাঁচ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৩৩ লাশ বরগুনা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে দুই জনের লাশ শনাক্ত হয়েছে।