গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাবের ) বর্তমান ও সাবেক মহাপরিচালকসহ সংস্থাটির ছয় শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ। তারা হলেন- র্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমান পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, র্যাবের বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার, জাহাঙ্গীর আলম ও মোহাম্মদ আনোয়ার লতিফ খান। এর মধ্যে বেনজীর আহমেদ ও মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও অর্থ দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অর্থ দপ্তরের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিস (ওএফএসি) বিভিন্ন দেশের ১০টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিপীড়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও মিয়ানমারের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনের শেষ দিনে এ নিষেধাজ্ঞা এলো। এতে আরও বলা হয়, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকায় আজ বেনজীর আহমেদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা ঘোষণা করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর- এর ফলে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে মানবাধিকার। যথাযথ উপায় অবলম্বন করে তা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক না কেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করা হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্তদের জবাবদিহিতায় আনার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ১০ই ডিসেম্বর দেয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। এই বিবৃতিতে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য জড়িত কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বৃটেন, কানাডার সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে সহিংসতা এবং নিষ্পেষণের জন্য দায়ী টার্গেটেড সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এমন পদক্ষেপের প্রশংসা করে যুযক্তরাষ্ট্র। অ্যান্টনি ব্লিনকেন তার বিবৃতিতে বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, বৃটেন এবং কানাডার সঙ্গে গত সপ্তাহে বেলারুশের বিরুদ্ধে এ যাবতকালের যে শক্তিশালী অবরোধ দেয়ার বিষয়ে সমন্বয় হয়েছে তাকে স্বাগত জানাই। এই যৌথ উদ্যোগে বেলারুশের জনগণের বিরুদ্ধে দেশটির প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো যে নিষ্ঠুরতা অব্যাহত রেখেছেন, তার মূল্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে মিত্র, অংশীদার ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরো বলেন, মানবাধিকার দিবস ২০২১ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফরেন অপারেশন্স এবং রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্ট,২০২১ এর ধারা ৭০৩১(সি)-এর অধীনে বিদেশি সরকারগুলোর ১২ জন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আইন বলে যে, বিদেশি কোনো কর্মকর্তা যদি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন, বড় দুর্নীতি করেন এবং এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তাহলে ওইসব ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদেরকে সরকারিভাবে, বেসরকারিভাবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। এক্ষেত্রে যাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম উগান্ডার পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের চিফট্যান্সি অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রধান মেজর জেনারেল আবেল কানদিহো। নির্যাতনসহ ভয়াবহ মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত তিনি। একই অভিযোগে এ সপ্তাহে তাকে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অবরোধ কর্মসূচির অধীনে শনাক্ত করেছে ডিপার্টমেন্ট অব দ্য ট্রেজারি। এর আওতায় আছেন চীনের সিনজিয়াংয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা শোহরাত জাকির, এরকেন তুনিয়াজ, হু লিয়ানহে এবং চেন মিঙ্গগুও। উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে খেয়ালখুশিমতো আটক সহ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা হয়েছে তাদেরকে। এর মধ্যে ডিপার্টমেন্ট অব দ্য ট্রেজারির গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অবরোধ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে শোহরাত জাকির এবং এরকেন তুনিয়াজকে। বেলারুশের মিনস্কে কুখ্যাত আক্রেস্তসিনা ডিটেনশন সেন্টারের প্রধান ইহার কেনিউখ এবং ইউহেনি শাপেটস্কার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনা হয়েছে। কারণ, তারা নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতাসহ ভয়াবহ মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। ২০২০ সালের ৯ই আগস্ট জালিয়াতির নির্বাচনের পর আটক ব্যক্তিদের ওপর এই নির্যাতন চালানো হয়। তাদের সঙ্গে অমানবিক, অশোভন আচরণ করা হয়, শাস্তি দেয়া হয়। এই তালিকায়ই রয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান আইজিপি এবং র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এবং র্যার ইউনিট-৭ এর সাবেক কমান্ডিং কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। ২০১৮ সালের মে মাসে টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হককে বিচারবহির্ভূত হত্যকাণ্ডের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত তারা। এই তালিকায় রয়েছেন শ্রীলঙ্কার নৌ গোয়েন্দা কর্মকর্তা চন্দনা হেত্তিয়ারাচ্ছি। তার বিরুদ্ধেও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ‘ত্রিনকোমালি ১১’-এর কমপক্ষে আটজন ভিকটিমকে মুক্তি দেয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এ ছাড়া আছেন শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর সাবেক স্টাফ সার্জেন্ট সুনীল রত্নায়েকে। তিনি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ২০০০ সালের ডিসেম্বরে তামিলদের কমপক্ষে আটটি গ্রামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিনি। এতে আরো আছেন মেক্সিকোর পুয়েবলার সাবেক গভর্নর মারিও প্লুতারকো মারিন টোরেস। তিনিও মেক্সিকোতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। বিশেষ করে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেয়ালখুশি মতো সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী লিদিয়া ক্যাচো’কে আটক করেন।