বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় আরো ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো: কামরুজ্জামানের আদালতে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এর আগে বুধবার সকালে আবরার হত্যা মামলায় গ্রেফতার ২২ আসামিকে কারাগার থেকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। গত ২৮ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও রায় প্রস্তুত না হওয়ায় বিচারক রায়ের জন্য ৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন। আগের ধার্য দিনে রায় ঘোষণা না করার বিষয়ে বিচারক বলেন, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, তা বিশ্লেষণ করে রায় প্রস্তুত করা এখনো সম্ভব হয়নি। রায় প্রস্তুত করতে আরো সময় লাগবে। তাই এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য করা হলো। গত ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো: কামরুজ্জামান রায় ঘোষণার জন্য ২৮ নভেম্বর দিন ধার্য করেছিলেন। উল্লেখ্য, ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জেরে আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ডেকে নেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। ওই দিনগত রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের দোতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে আবরারের লাশের ময়নাতদন্ত হয়। নিহত আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন তিনি। ওই ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান। অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে এজাহারভুক্ত ১৯ জন ও তদন্তে প্রাপ্ত আরো ছয়জন। এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জন ও এজাহার-বহির্ভূত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন। রায়ে মৃত্যুপ্রাপ্তরা হলেন, বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো: অনিক সরকার, উপ-সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররেফ সকাল, ক্রীড়া সম্পাদক মো: মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, মো: মনিরুজ্জামান মনির, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, শিক্ষার্থী মো: মুজাহিদুর রহমান ও এ এস এম নাজমুস সাদাত, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, মুনতাসির আল জেমি, শিক্ষার্থী আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান, শাসছুল আরেফিন রাফাত, মো: মাজেদুর রহমান মাজেদ, শামীম বিল্লাহ, হোসেন মোহাম্মাদ তোহা, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র মোর্শেদ অমত্য ইসলাম ও এস এম মাহমুদ সেতু, বুয়েটের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র মুহাম্মাদ মোর্শেদ-উজ-জামান মন্ডল ওরফে জিসান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র মুজতবা রাফিদ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতামিম ফুয়াদ, গ্রন্থ ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ইসাতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আকাশ হোসেন ও মুয়াজ ওরফে আবু হুরায়রা। তবে রায়ে সন্তুষ্ট নন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মেদ উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘এ রায়ে আসামিপক্ষ সন্তুষ্ট না। এই মামলায় যারা মাস্টারমাইন্ড ছিল তাদের এ মামলায় আনা হয়নি। অনেক সাক্ষীর বক্তব্য সেভাবে শোনা হয়নি। আমরা এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’ এদিকে রায় শোনার পর কুষ্টিয়ার বাসায় অঝোরে কেঁদেছেন আবরারের মা রোকেয়া খাতুন। প্রতিবেশীরা তাকে কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। সব আসামির মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন মা রোকেয়া খাতুন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা অমিত সাহ ঘটনাস্থলে না থাকলেও মোবাইলের মাধ্যমে সে হত্যাকাণ্ডের সব পরিকল্পনা করেন। অথচ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। কিভাবে সে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাদ গেল- আমি বুঝতে পারলাম না। আপনারাও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে দেখেছেন হত্যাকাণ্ডে ২৫ আসামি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। তাহলে কিভাবে ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড থেকে বাদ গেল। রোকেয়া খাতুন বলেন, আববার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী অমিত সাহার মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে আমাদের উকিলের সাথে আমরা পরামর্শ করে উচ্চ আদালতে আপিল করব। বুধবার দুপুরে শহীদ আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পরে কুষ্টিয়া শহরের নিজ বাড়িতে এসব কথা বলেন আবরারের মা রোকেয়া খাতুন। মামলায় এই রায় শুনে কাঁদলেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকতুল্লাহও। ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বরকতুল্লাহ বলেন, আদালতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই রায় উচ্চ আদালতে যেন বহাল থাকে। এ সময় বরকতুল্লাহ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান। তিনি বলেন, মোবাইলে যোগাযোগ করে অমিত সাহা হত্যার আদেশ দিলেও তার মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় আমি হতাশ। সে সময় তিনি নয়া দিগন্তকে আরো জানান, সেময় ৫ তারিখের একটা মিটিং-এ অমিত সাহা উপস্থিত ছিলেন এবং আবরারকে হত্যার নির্দেশ দাতার তিনি একজন মূল হোতা। আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ আবরার জানান, আমরা আশা করেছিলাম সবারই মৃত্যুদণ্ড রায় হবে। বিশেষ করে অমিত সাহার বিষয়ে আমরা হতাশ। মোবাইল ফোনের ম্যাসেনজারে আড়াল থেকে হলেও তার সক্রিয় নির্দেষনা ছিল। আইনজীবীদের সাথে কথা বলে বাকি ৫ জনের রায় পুনঃবিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের আশা করবো আমরা। মামলার তিন আসামি এখনো পলাতক। তারা হলেন- মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মোস্তবা রাফিদ। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন এজাহারভুক্ত ও শেষের জন এজাহার-বহির্ভূত আসামি। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো: কামরুজ্জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলায় মোট ৬০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।